আজগর সালেহী, চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ
প্রশাসন, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অল্প খরচে অধিক মুনাফা এবং লাকড়ির সহজলভ্যতায় চট্টগ্রামে যত্রতত্র গড়ে উঠছে ইটভাটা। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে পড়ছে প্রভাব।
প্রশাসনের যথাযথ উদ্যোগ না থাকায় মিলছে না দীর্ঘমেয়াদী সুফল।
পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যমতে চট্টগ্রাম জেলায় মোট ইট ভাটার সংখ্যা ৪০৮টি। এর মধ্যে ফিক্সড চিমনি (৮০-১২০ ফুট) ২৮৪টি, জিগজ্যাগ চিমনি ১২১টি এবং অনান্য ইটভাটা আছে ৩টি। ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব ইটভাটার মধ্যে ৩১০টির পরিবেশগত ছাড়পত্র মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা অনুমোদনপত্রই নেই।
এছাড়া রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ৫৪ টি, ফটিকছড়ি উপজেলায় ৫২ টি, লোহাগাড়া উপজেলায় ৩৩ টি, রাউজান উপজেলায় ৩৩ টি, হাটহাজারী উপজেলায় ৩১ টি, চন্দনাইশে ২৮ টি, মিরসরাইয়ে ১৩ টি, কর্ণফুলী এলাকায় ১০টি, সন্দ্বীপে ৬ টি, বাঁশখালীতে ৬ টি, সীতাকুণ্ডে ৪ টি, বোয়ালখালীতে ৪ টি, আনোয়ারায় ২ টি ইটভাটা রয়েছে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এর ৫ (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনও ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হতে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া ৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসেবে কোনও জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করতে পারবেন না। ’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ৪০৮ ইটভাটার মধ্যে ২৭৬টি পাহাড়বেষ্টিত উপজেলা সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান এবং চন্দনাইশে অবস্থিত। এই সাত উপজেলায় গড়ে ওঠা ৮০ শতাংশ ইটভাটার প্রধান কাঁচামাল মাটির যোগান আসছে পাহাড়ি মাটি বা টিলা থেকে। এছাড়া জ্বালানি হিসেবে এখনও বিভিন্ন ইটভাটায় ব্যবহার হচ্ছে পাহাড় থেকে কেটে আনা কাঠ।
পাহাড়ি অঞ্চলে ইটভাটা স্থাপনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে জানান গবেষকরা। এছাড়া এসব এলাকায় ইটভাটা থাকায় বায়ু দূষণের পাশাপাশি পাহাড় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বলেও দাবি তাদের।
ইটভাটার পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে গবেষণা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল।

তিনি বলেন, ইটভাটার কারণে পরিবেশের কি ক্ষতি হচ্ছে- তা যাচাইয়ে আমরা বেশকিছু স্টাডি করেছি। ইটভাটায় যেসব কয়লা ব্যবহার করা হয় তা অত্যন্ত নিম্নমানের। এছাড়া তারা টায়ার ও গার্মেন্টের ঝুট কাপড় জ্বালিয়ে ইট পুড়িয়ে থাকে। ফলে ব্যাপক পরিমাণ বায়ু দূষণ হচ্ছে। ইটভাটায় পোড়ানো জ্বালানির ছাই উড়ে গিয়ে আশপাশে কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। ইটভাটাবেষ্টিত এলাকায় কোনও ধরনের ফসল উৎপাদন হয় না।
তিনি আরও বলেন, এসব এলাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠির ওপর স্বাস্থ্যগত প্রভাবও পড়ছে। এলার্জির সমস্যা ছাড়াও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন অনেকে। এসব ক্ষতি থেকে বাঁচার উপায় হতে পারে- পরিবেশ ঠিক রেখে বিকল্প পদ্ধতিতে ইট উৎপাদন।
২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষ থেকে ইটভাটা বন্ধে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করা হয়। আদালত এক সপ্তাহের মধ্যে অবৈধ ইটভাটা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি রিটের শুনানি শেষে পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়া চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা সবগুলো অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। এরপর থেকে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের অভিযান শুরু হলেও অজ্ঞাত কারণে আবারও মাঝপথে থমকে যায় এ কার্যক্রম।
অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রসাশন, স্থানীয় সংবাদকর্মী ও রাজনৈতিক নেতাদের মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে এই অভিযান মাঝপথে বন্ধ করা হয়।
গত ২০ জানুয়ারি ডিসি সম্মেলনে আবারও অবৈধ ইটভাটা বন্ধের বিষয়টি উঠে আসে। সম্মেলনের ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি নেই।

অবৈধ ইটভাটা বন্ধে জেলা প্রশাসন কি উদ্যোগ নিচ্ছে, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ইটভাটাগুলোকে শতভাগ পরিবেশবান্ধব ইট ‘হলো ব্রিকস’ উৎপাদনে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ‘হলো ব্রিকস’ উৎপাদনে চট্টগ্রামের ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। যারা এই ইট তৈরিতে আগ্রহী তাদের লাইসেন্স দিতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এছাড়া ট্রেডিশনাল ইটভাটার নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে।
অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না পরিবেশ অধিদফতর। পরিবেশ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা না প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইটভাটার মালিকরা বেশিরভাগই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকেন। অভিযান পরিচালনা করতে গেলে বিভিন্ন তদবির শুরু হয়ে যায়। ফলে কোনও উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া দুর্গম এলাকা হওয়ায় প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে অভিযান পরিচালনা করা যায় না।
পরিবেশ অধিদফতর-চট্টগ্রাম এর পরিদর্শক মঈনুদ্দিন বলেন, অনুমোদনহীন ইটভাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদফতর সবসময় শক্ত অবস্থানে। কিন্তু লোকবল সংকটে অনেক সময় অভিযান পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হয়।
সরেজমিনে গিয়ে কোনও প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া আমাদের পক্ষে অনেক সময় সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তারপরও সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
সন্দীপ, রাউজান, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, লোহাগড়া এবং কর্ণফুলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে বেশিরভাগই জানিয়েছেন, অনুমোদনহীন ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে, মাটি কাটা এবং গাছ পোড়ানোর বিষয়টি পরিবেশ অধিদফতরের দায়িত্বে রয়েছে, আর সেক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের কিছু করার নেই। এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের গুরুত্ব রয়েছে।
বৈধ অবৈধ এসব ইটভাটা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিনিয়ত কাঠ পড়াচ্ছে এবং দেদারসে কাটছে ফসলি জমির উর্বর মাটি।
এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সরাসরি বেসরকারি বনাঞ্চল ধ্বংস হবে এবং একমুঠো ধান লাগানোর মত ফসলি জমি অবশিষ্ট থাকবে না।