সোহাগ হোসেন, তাড়াশ প্রতিনিধিঃ
রমজান এলেই মধ্যরাতে তাড়াশ পৌর শহরের অলিগলিতে ভেসে আসে পরিচিত সুর— রোজাদারো উঠো, সেহরিকা ওয়াক্ত হো চুকা হে! জাল্দ উঠো আওর সেহরি কারলো! যুগ যুগ ধরে এভাবেই রোজাদারদের ঘুম ভাঙিয়ে সেহরির জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানিয়ে আসছে কাফেলা তথা ঘুম জাগানিয়া দল।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ পৌর শহরের এই ঐতিহ্য শত বছর ধরে চলে আসছে। শহরের বাঁশবাড়ি আলেফ মোড় থেকে মালেকের কাফেলা, গোডাউন মোড় থেকে আশরাফি কাফেলা, দক্ষিণপাড়া থেকে মিজানুরের কাফেলা— এভাবেই প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গজল গেয়ে, মাইক লাগানো রিকশায় সুর তুলে রোজাদারদের ডেকে তোলা হয়।
তবে কালের বিবর্তনে কাফেলার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। একসময় প্রতিটি মহল্লায় একাধিক কাফেলা থাকলেও এখন তাড়াশ পৌর শহরে গুটিকয়েক কাফেলাই অবশিষ্ট রয়েছে।
মালেক কাফেলার প্রধান জাহাঙ্গীর আলী জানান, রমজানের প্রথম দিন থেকে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত প্রতিদিন রাত ২টার দিকে রোজাদারদের জাগানোর কাজ করি। আমাদের ডাক শুনে শিশুরাও উঁকি মেরে দেখে, তাদের আনন্দ দেয়। আমরা এটিকে পরম পূণ্যের কাজ মনে করি।
পৌর শহরের গৃহিণী রাশিদা বেগম বলেন, আমাদের ছোটবেলায় ঘড়ির প্রচলন ছিল না। তখন থেকেই কাফেলার ডাক শুনে সেহরির জন্য জেগে উঠতাম। এখনো সেই স্মৃতি বয়ে চলেছে।
শহরের গোডাউন মোড়ের মাহাফুজা বেগম স্মৃতিচারণ করে বলেন, বাবা-মা ছোটবেলায় রোজা রাখতে দিতেন না, কিন্তু কাফেলার হাঁকডাক শুনে লুকিয়ে সেহরির টেবিলে বসতাম।
যদিও প্রযুক্তির বিকাশে অনেকেই এখন মোবাইল ফোনের অ্যালার্ম দিয়ে জেগে ওঠেন, তবুও তাড়াশের কিছু মানুষ এখনও এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
কাফেলার সদস্যদের নির্দিষ্ট কোনো পারিশ্রমিক নেই। কেউ খুশি হয়ে প্রতিদিন কিছু দেন, আবার কেউ ঈদের আগে একবারে টাকা দেন। একেকটি কাফেলার রমজান মাসে আয় হয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা।
তাড়াশের অনেকেই মনে করেন, কাফেলার ডাক একসময় অতীত হয়ে যাবে। তবে এখনো কিছু পরিবারের জন্য রোজার রাতে কাফেলার সুরেলা আহ্বানই ঘুম ভাঙানোর প্রধান মাধ্যম।