মোঃ আশরাফুল ইসলাম, মিঠাপুকুর প্রতিনিধিঃ
রংপুরের মিঠাপুকুরে ২০১৩ সালের আলোচিত হ’ত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অবশেষে মামলা দায়ের হয়েছে। গত ৯ই মার্চ ২০২৫, মিঠাপুকুর থানায় সাবেক সংসদ সদস্য আশিকুর রহমান, আওয়ামী লীগ নেতা রাশেক রহমান, জাকির হোসেন সরকার, কামরুজ্জামান কামরু, আনোয়ার সাদাত লিমন, তুহিন, সাঈদ তালুকদার, মোজ্জামেল হক মিন্টু, মেজবাহুর রহমান মঞ্জু, ইদ্রিস আলী, আঃ মতিন, রবিউল ইসলাম পরামানিকসহ ২২৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৪০-৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সেই ভয়াল দিন: দিনের আলোতে ৭টি প্রাণহানি
২০১৩ সালের সেই দিনটি মিঠাপুকুরবাসী এখনো ভুলতে পারেনি। আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার রায়ের দিন, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, দিনের আলোতেই ৭ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল পরিকল্পিত হ’ত্যাকাণ্ড।
১২ বছর পর মামলা, কিন্তু এতদিন বিচার হয়নি কেন?
দীর্ঘ ১২ বছর এই মামলাটি আলোর মুখ দেখেনি। নিহতদের পরিবার বারবার বিচার চাইলেও তা কার্যকর হয়নি।
কেন এই বিচার এতদিন আটকে ছিল?
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের প্রভাবেই মামলাটি ধামাচাপা পড়ে।
স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অংশ মামলাটি নিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করে।
রাজনৈতিক কারণে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।
কিন্তু সময় বদলেছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অবশেষে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের হলো।
মিঠাপুকুরের রাজনীতির অন্ধকার অধ্যায়
মিঠাপুকুরের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে মামলা, হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে জর্জরিত ছিল।
“মামলা বাণিজ্য” ও দালাল চক্র
সাবেক এমপি আশিকুর রহমানের ছেলে রাশেক রহমান তার রাজনৈতিক স্বার্থে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের ব্যবহার করেছেন। সাবেক এমপি আশিকুর রহমান বা তার ছেলে রাশেক রহমান সরাসরি কোনো মামলার বাদী হননি। তারা নিজেরা সামনে না এসে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের ব্যবহার করেছেন। স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়ে তাদের হয়রানি করা হতো। কেউ বাদী, কেউ সাক্ষী—এভাবেই মামলাগুলো সাজানো হতো। আজ সময় বদলেছে, যে কৌশলে তারা অন্যদের ফাঁসিয়েছিলেন, আজ তারই ফল ভোগ করছেন।
বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মামলা দেওয়ার জন্য স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে তালিকা তৈরি করা হতো।
প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হতো।
মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করত একটি চক্র।
ভুক্তভোগীদের দুঃসহ জীবন
বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীরা বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়াতেন।
অনেকে বাড়িতে ফিরতে পারেননি, স্ত্রী-সন্তানদের ছেড়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
ঈদ ও অন্যান্য পারিবারিক উৎসবেও কেউ কেউ এলাকায় ফিরতে পারেননি।
প্রকৃতির প্রতিশোধ নাকি ন্যায়বিচার?
এখন সেই সময়ের ক্ষমতাশালী নেতারাই বিচারের মুখোমুখি। যারা একদিন মামলা দিয়ে অন্যদের হয়রান করেছিলেন, আজ তারাই আসামির তালিকায়।
প্রশ্ন উঠেছে—
এটি কি ন্যায়বিচারের শুরু?
নাকি নতুন রাজনৈতিক প্রতিশোধের খেলা?
যে কারণেই হোক, এটি নিশ্চিত যে মিঠাপুকুরের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এই ঘটনার শিক্ষা: ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না
এই মামলা শুধু মিঠাপুকুর নয়, পুরো দেশের রাজনীতির জন্যই একটি বার্তা বহন করে।
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, অন্যায় যতই দীর্ঘস্থায়ী হোক, ইতিহাস একদিন ফিরে আসে।