১লা জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১২ই রজব, ১৪৪৭ হিজরি

নীলফামারীতে শীতের দাপটে বিপর্যস্ত জনজীবন: কৃষি ও খেটে–খাওয়া মানুষের কষ্ট চরমে

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস, ঘন কুয়াশা ও নিম্ন তাপমাত্রার দাপটে নীলফামারীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) ভোর থেকেই জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় শীতের তীব্র প্রভাব অনুভূত হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষিনির্ভর মানুষ, দিনমজুর, রিকশা–ভ্যানচালকসহ খেটে–খাওয়া সাধারণ মানুষ।

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল ৯টায় সৈয়দপুর উপজেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় প্রায় ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দুপুরে সূর্যের দেখা মিললেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রির বেশি ওঠেনি। সন্ধ্যার পর তা আবার কমে ১৪ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। বাতাস শুষ্ক থাকলেও শীতের অনুভূতি ছিল তীব্র।

ডিমলা উপজেলায় সরাসরি তাপমাত্রা পরিমাপের তথ্য না থাকলেও ভৌগোলিক অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সৈয়দপুরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এখানেও তাপমাত্রা ১৪ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাতের দিকে তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রির কাছাকাছি নেমে আসায় শীতের প্রকোপ আরও বেড়ে যায়।
শীতের কারণে ভোরবেলা মাঠে কাজ শুরু করতে পারছেন না কৃষক ও কৃষিশ্রমিকরা। বোরো ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত ও আলুর মাঠে শ্রমিকদের কাজের গতি ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক ধীর। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে অনেক দিনমজুর কাজে বের হতে পারছেন না, ফলে দৈনিক আয়ের ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

ডিমলা উপজেলার কৃষিশ্রমিক আব্দুল কাদের (৪৫) বলেন, “ভোরে মাঠে নামা যায় না। হাত-পা অবশ হয়ে আসে। আগে সকাল সাতটা থেকে কাজ শুরু করতাম, এখন নয়টার আগে সম্ভব হয় না। এতে মজুরি কমে যাচ্ছে।”

একই উপজেলার দিনমজুর রফিকুল ইসলাম জানান, “শীতবস্ত্র নেই বললেই চলে। পাতলা কাপড় পরে কাজ করতে হয়। রোদ উঠলে কিছুটা ভালো লাগে, কিন্তু বিকাল নামলেই আবার কাজ বন্ধ করতে হয়।”

নীলফামারী সদর উপজেলার সবজি ক্ষেতের শ্রমিক শাহিনা বেগম বলেন, “মেয়েদের জন্য শীতটা আরও কষ্টের। কাজ কম হলে আয়ও কমে যায়, অথচ বাজারের সব জিনিসের দাম বাড়ছে।”

শীত ও কুয়াশার প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। ভোরের ঘন কুয়াশায় সড়কে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

নীলফামারী শহরের রিকশাচালক আবু তাহের (৫০) বলেন, “ভোরে রাস্তায় নামা খুব কষ্টকর। ঠাণ্ডায় হাত শক্ত হয়ে যায়। যাত্রীও কম থাকে।”

সৈয়দপুর পৌর এলাকার অটোরিকশাচালক সোহেল রানা বলেন, “শীতে যাত্রী কমে যায়। অসুস্থ লাগলেও কাজ বন্ধ করলে সংসার চলবে না।”

নীলফামারী–ঢাকা রুটের বাসচালক আব্দুস সালাম জানান, “ভোরের কুয়াশায় গাড়ি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। ধীরে চালাতে হয়, সময়ও বেশি লাগে।”

একজন ট্রাকচালক হারুন অর রশিদ বলেন,
“রাতে কুয়াশা আর ঠাণ্ডায় চোখে ঠিকমতো দেখা যায় না। দুর্ঘটনার ভয় সব সময় থাকে।”

এদিকে শহরের মুচি রহিম উদ্দিন জানান,
“শীতে মানুষের চলাফেরা কমে যায়। কাজও কমে যায়, আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন।”

অন্যদিকে, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলা সদর ও বিভিন্ন উপজেলায় পুরাতন কাপড়ের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। বিশেষ করে সৈয়দপুর রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা জনপ্রিয় ‘লন্ডন মার্কেট’ এখন নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের বড় ভরসা।

দিনমজুর আলাউদ্দিন (৪০) বলেন, “নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। এখানে ২০০–৩০০ টাকায় জ্যাকেট পাওয়া যায়।”

ভ্যানচালক আমিনুল ইসলাম জানান, “পুরাতন হলেও মোটা কাপড় না হলে শীতে কাজ করা যায় না।”

গৃহিণী হাসিনা বেগম বলেন, “স্বামীর আয় কম। বাচ্চাদের জন্য এখান থেকেই কম দামে কাপড় নিতে পারছি।”

ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, “শীত বাড়তেই ক্রেতা বেড়েছে। এখন দিনে ৭০–৮০ জন আসছেন।”

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে,উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এর প্রভাবে আগামী কয়েকদিন সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা আরও এক থেকে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে, যা কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এতে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ও সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চলমান শীত পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত দরিদ্র, ছিন্নমূল ও খেটে–খাওয়া মানুষের জন্য শীতবস্ত্র সহায়তা বাড়ানো হোক। তা না হলে শীতের এই দাপটে সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোর জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top