মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
হিমেল উত্তরের হাওয়া আর ঘন কুয়াশার দাপটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নীলফামারীর জনজীবন। কয়েক দিন ধরে টানা শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে জেলার তাপমাত্রা ক্রমাগত কমছিল। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) নীলফামারীতে চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তীব্র শীতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
ডিমলা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ৬টায় ডিমলা অঞ্চলে সর্বনিম্ন ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৬ শতাংশ এবং বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার। আগের দিন জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে বর্তমানে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
তীব্র শীতের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। কনকনে ঠান্ডা ও সূর্যের অনুপস্থিতিতে অনেকেই কাজে বের হতে পারছেন না। ফলে দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালকসহ শ্রমজীবী মানুষের আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
ডিমলার তিস্তা নদীর চরের বাসিন্দা দিনমজুর রবিউল ইসলাম বলেন, “চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে। টানা চার দিন ধরে রোদের দেখা নেই। এত ঠান্ডায় কাজ করা তো দূরের কথা, ঘর থেকে বের হওয়াই কষ্টকর হয়ে গেছে।”
ডিমলা উপজেলার একটি কৃষিজমিতে কাজ করা দিনমজুর শফিকুল ইসলাম (৪৫) বলেন,
“ভোর হলে জমিতে নামতে হয়। কিন্তু এই ঠান্ডায় হাত-পা অবশ হয়ে আসে। কাজ ঠিকমতো করা যায় না। অথচ কাজ না করলে ঘরে চুলা জ্বলে না।”
একই উপজেলার কৃষিশ্রমিক রতন মিয়া (৩৮) জানান, “ঘন কুয়াশার কারণে সকালে মাঠে কাজ শুরু করা যায় না। দুপুরের আগে শরীর গরম হয় না। কাজও কম, মজুরিও আগের চেয়ে কম পাচ্ছি।”
ডোমার উপজেলার দিনমজুর ফারুক হোসেন (৫০) বলেন, “শীতের সময় কাজ থাকলেও শরীর সায় দেয় না। বয়স্ক মানুষদের জন্য এই ঠান্ডা খুব কষ্টের। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়ার টাকাও জোগাড় করা কঠিন।”
নীলফামারী সদরের কৃষিশ্রমিক রোজিনা বেগম (৪০) বলেন, “স্বামী অসুস্থ। সংসার চালাতে আমাকে মাঠে কাজ করতে হয়। এই ঠান্ডায় কাজ করলে জ্বর-সর্দি লেগেই থাকে। তবুও কাজ না করলে না খেয়ে থাকতে হয়।”
বয়স্ক কৃষিশ্রমিক আব্দুল কাদের (৬৫) বলেন,
“আগে এমন শীত হতো, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহ্য করা কঠিন হয়ে গেছে। একটা মোটা কম্বল হলে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম।”
এদিকে তীব্র শীতে অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়াতে নীলফামারী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান গভীর রাতে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, বাস টার্মিনাল ও শহরের বিভিন্ন ফুটপাতে আশ্রয় নেওয়া ছিন্নমূল মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করছেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, “শীতের কনকনে ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষ। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।”
তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতি শীতার্ত মানুষের পাশে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, তীব্র শীতের এই সময়ে দ্রুত ও সমন্বিত সহায়তা বাড়ানো না হলে জেলার দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।