মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীতে ফসলি জমির উর্বর টপ সয়েল নির্বিচারে কেটে ইটভাটা ও সেচ ক্যানেলে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমির উর্বরতা ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিবছর কমে যাচ্ছে ফসলের উৎপাদন। প্রশাসনের দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপের অভাব এবং সহজেই মাটি বিক্রির সুযোগ থাকায় পুরো জেলাজুড়ে চলছে মাটি কাটার এক ভয়ংকর মহোৎসব।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নে রাস্তার পাশের তিন ফসলি জমি কেটে সেই মাটি সেচ খালে ফেলা হচ্ছে। এছাড়া সৈয়দপুরের কামারপুকুর, কাশিরাম বেলপুকুর, বাঙালিপুর ও খাতামধুপুর নীলফামারী সদরের সোনারায়, সংগলশি, চওড়া ও চড়াইখোলা ডোমারের সোনারায়, হরিণচড়া ও ডোমার, জলঢাকার কাঁঠালি, ধর্মপাল ও পৌরসভা, কিশোরগঞ্জের বাহাগিলি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় জমির টপ সয়েল কাটার ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। এসব জায়গায় ফসলি জমিগুলোতে বড় বড় গর্ত দেখা যায়। কোথাও আবার জমির একাংশ কেটে নেওয়ায় পাশের জমি দেবে গেছে। ভেকু মেশিন ও ট্রাক্টর ব্যবহার করে মাটি তোলা ও স্থানান্তরের কাজ করা হয়। পরে সেগুলো নেওয়া হয় ইটভাটা কিংবা ক্যানেলের পাড়ে। সেখানে মাটি স্তূপ করে রাখা হয়।

কৃষিপ্রধান জেলায় উর্বরতা ধ্বংসের উৎসব
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষিপ্রধান নীলফামারীতে প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই জেলার জমির সবচেয়ে উর্বর অংশ—টপ সয়েল—বছরের পর বছর ধরে নির্বিঘ্নে কেটে নেওয়া হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই মাটি কাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে, ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জমির উপরের ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি মাটির স্তরেই থাকে মূল পুষ্টিগুণ। এই স্তর কেটে নেওয়া হলে জমির উর্বরতা কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি মাটি কাটা জমিতে চাষের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কৃষি বিভাগের একটি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর নীলফামারীতে প্রায় ২০ কোটি কিউবিক ফুট টপ সয়েল কেটে নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারীতে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ইটভাটার সংখ্যা ৫৩টি। এর মধ্যে ৩১টি রয়েছে সৈয়দপুর উপজেলায়। ইটভাটার কাঁচামালের চাহিদা মেটাতেই এই উপজেলায় সবচেয়ে বেশি টপ সয়েল কাটা হচ্ছে।

সচেতন কৃষকদের মতে, টপ সয়েল বিক্রি করে তাৎক্ষণিক কিছু টাকা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি ভয়াবহ। এতে শুধু একটি জমিই নয়, আশপাশের জমির উৎপাদন ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাস্তাঘাট, তৈরি হচ্ছে প্রাণঘাতী গর্ত।
সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর এলাকার কৃষক তাহেরুল ইসলাম বলেন,
“সাময়িক লাভের আশায় মাটি বিক্রি করেছিলাম। পরে বুঝেছি ক্ষতি কত বড়। জমি কাটার পর আর আগের মতো ফসল হয় না, পানি ধরে না।”
নীলফামারী সদরের বাহালিপাড়া এলাকার কৃষক রমানাথ রায় বলেন, “আগে একবার সেচ দিলেই চলত, এখন দুই-তিনবার সেচ দিতে হয়। লাভ নেই, খরচই বাড়ছে। মাটি কাটার কারণে জমির উচ্চতা নষ্ট হয়ে গেছে, সেচব্যবস্থায় মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে।”
এদিকে, টপ সয়েল কাটার সঙ্গে যুক্ত ট্রাক্টর ও ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচলে গ্রামীণ সড়কগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও রাস্তা ভেঙে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। বর্ষা মৌসুমে এসব রাস্তায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, রোগীবাহী যান ও সাধারণ মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
এ বিষয়ে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী সাজু দাবি করেন, “আমরা অনুমতি নিয়েই সেচ খালের পাড় নির্মাণে মাটি কাটছি।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি কাজের নামে তিন ফসলি আবাদি জমির মাটি নির্বিচারে কাটা হচ্ছে।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, “তিন ফসলি জমির মাটি কাটার কোনো সুযোগ নেই। টপ সয়েল নষ্ট হলে তা স্বাভাবিক হতে ১০ থেকে ১৫ বছর লাগে।”

কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিমা আঞ্জুম সোহানিয়া বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে এটি বন্ধ করা দরকার। অনুমতির বিষয়ে তিনি যৌথ রেজ্যুলেশন অনুযায়ী অনুমতির প্রক্রিয়া থাকলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এখনো হাতে আসেনি বলে জানান।”
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন,
“ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হচ্ছে। তবে মূল হোতারা কৌশলে পালিয়ে যাচ্ছে।”
নীলফামারী সদরের চড়াইখোলা ইউনিয়নের বাসিন্দা সোলেমান শেখ বলেন, “এ বছর টপ সয়েল কাটার মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। অসাধু মাটির ব্যবসায়ীরা কৃষকদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নামমাত্র দামে মাটি কিনে নিচ্ছে। পরে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করছে। লাভবান হচ্ছে দালালরা, ধ্বংস হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ কৃষি। প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকায় এই লুটপাট প্রকাশ্যেই চলছে।”
অবিলম্বে কৃষিজমি থেকে টপ সয়েল কাটা বন্ধ, ট্রাক্টর ও ভারী যান চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ রাস্তাঘাট দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন কৃষক ও এলাকাবাসী। অন্যথায়, কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবন রক্ষায় বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।