১০ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২১শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

নীলফামারীতে এলপিজি গ্যাস সিন্ডিকেটের কবলে সাধারণ মানুষ

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

নীলফামারী জেলা সদরে হঠাৎ করেই তীব্র সংকটে পড়েছে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের বাজার। সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে এক শ্রেণির ডিলার ও পরিবেশকের কারসাজিতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দাম বাড়ার আগেই অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি হলেও দাম বাড়ার পরপরই বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে গ্যাস।

বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অতিরিক্ত দাম দিয়েও গ্যাস সিলিন্ডার পাচ্ছেন না সাধারণ ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কোথাও কোথাও অল্প কিছু সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও তা সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে রান্নাঘরের পাশাপাশি হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

খুচরা বিক্রেতারা জানান, ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দাম দিতে রাজি থাকলেও প্রয়োজনমতো সরবরাহ মিলছে না। ফলে দোকানে অল্প কিছু সিলিন্ডার এলেও তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

বাজার ঘুরে জানা গেছে, সিলিন্ডারের দাম বাড়তে পারে—এমন খবর ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই ডিলাররা দাম বাড়িয়ে দেন। গত কয়েকদিন প্রতিটি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। অথচ দাম কার্যকর হওয়ার পর থেকেই গ্যাস সিলিন্ডার রহস্যজনকভাবে বাজার থেকে উধাও।

নীলফামারী সদরের কাজীরহাট এলাকার ইপিজেড শ্রমিক লিপি আক্তার বলেন, “হঠাৎ গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর দুই দিন ধরে কোথাও সিলিন্ডার পাচ্ছি না। শীতের মধ্যে বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় রান্না করছি। দাম বাড়ার আগেই সিন্ডিকেটরা দাম বাড়িয়েছে, এখন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আরও বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করছে। প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা জরুরি।”

সিন্ডিকেটের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করছেন খুচরা বিক্রেতারাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা বলেন, “ডিলারদের টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অল্প কিছু সিলিন্ডার দিলে তার দাম অনেক বেশি রাখছে, আবার কোনো মেমোও দিচ্ছে না। বাধ্য হয়েই আমরাও বেশি দামে বিক্রি করছি।”

উত্তরা ইপিজেড এলাকার গ্যাস ব্যবসায়ীরা জানান, বসুন্ধরা, যমুনা ও জেএমআই গ্যাসের সিলিন্ডার ডিলারদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না। ওমেরা গ্যাস সীমিত পরিমাণে পাওয়া গেলেও ডিলার চাহিদামতো সরবরাহ করছে না—একেক দোকানে ৪ থেকে ৬টি করে সিলিন্ডার দিচ্ছে। অতিরিক্ত দাম নেওয়ার পাশাপাশি কোনো মেমোও দিচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, ওমেরা এলপিজি গ্যাসের পরিবেশক মেসার্স বি.এস ট্রেডার্সের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে গ্যাসের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া সম্ভব। এ বিষয়ে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স বি.এস ট্রেডার্সের প্রতিনিধি ভোলানাথ সরকার বলেন, “আমরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে সিরাজগঞ্জ ও খুলনা থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে নিজ খরচে নীলফামারীতে নিয়ে আসি। পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ী পর্যায়ে প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করছি।”

মেমো না দেওয়ার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, “ড্রাইভার লিখতে না পারায় মেমো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”

উল্লেখ্য, চলতি জানুয়ারি মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা, যা গত মাসে ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। অর্থাৎ জানুয়ারিতে দাম বেড়েছে মাত্র ৫৩ টাকা। অথচ বাস্তবে তার কয়েকগুণ বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তারা বলছেন, দ্রুত অভিযান চালিয়ে মজুতদারি, অতিরিক্ত দাম আদায় ও মেমোবিহীন বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই কৃত্রিম সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কবে এই গ্যাস সিন্ডিকেটের লাগাম টেনে ধরে জনভোগান্তির অবসান ঘটায়।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top