রাজনীতি করবেন, না হয় আপনাকে নিয়ে রাজনীতি করা হবে। যদি আপনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করেন, তাহলে রাজনীতি আপনাকে ছাড়বে না। এটি মূলত প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক পেরিক্লিসের একটি উক্তির অনুরূপ, যা বলে, শুধুমাত্র রাজনীতিতে আগ্রহ না থাকলেই রাজনীতি আপনার প্রতি আগ্রহী হবে না এমন নয় অথবা ১৯শ শতাব্দীর ফরাসি রাজনীতিবিদ চার্লস ডি মনটালেমবার্টের কথা, যদি আপনি রাজনীতি না করেন, তাহলে রাজনীতি আপনাকে করবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উক্তিটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখায় যে নিষ্ক্রিয়তা বা উদাসীনতা প্রায়ই ব্যক্তি ও সমাজকে রাজনৈতিক ঘূর্ণিপাকে টেনে নিয়ে যায়। পেরিক্লিস রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতেন। রেডিট এবং অন্যান্য সোর্সে এটিকে রাল্ফ নেডারের মতো আধুনিক রাজনীতিবিদের সাথেও যুক্ত করা হয়েছে, যিনি বলেছেন, যদি আপনি রাজনীতিতে না ঘুরেন, তাহলে রাজনীতি আপনার উপর ঘুরবে। বাংলাদেশে এটি একটি সাধারণ প্রবাদের মতো ব্যবহৃত হয়, আপনি যদি রাজনীতি না করেন, রাজনীতি আপনাকে ছাড়বে না। এটি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করার শাস্তিকে তুলে ধরে, যেমন প্লেটোর উক্তি, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করার শাস্তি হলো, তুমি তোমার চেয়ে নিচু ও অযোগ্যদের দ্বারা শাসিত হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধারণা বারবার প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের উদাসীনতা সামরিক শাসন বা কর্তৃত্ববাদী শাসনকে উত্থান করতে সাহায্য করেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসঃ স্বাধীনতা থেকে সামরিক শাসন পর্যন্ত
বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে শুরু হয়, যখন পূর্ব পাকিস্তান,পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে ২৯৩টি আসন জিতে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ এবং দুর্নীতির কারণে ১৯৭৪ সালে জরুরি অবস্থা জারি হয়, এবং ১৯৭৫ সালে একদলীয় ব্যবস্থা (বাকশাল) চালু হয় এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে মুজিব সপরিবারে নিহত হন, যা দেশকে সামরিক শাসনের যুগে নিয়ে যায়।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৫-১৯৮১ সাল পর্যন্ত শাসন করেন, মার্শাল ল জারি করে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন এবং ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে তার বিএনপি জয়ী হয় কিন্তু ১৯৮১ সালে তিনি নিহত হন। পরবর্তীতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালে অভ্যুত্থান করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তার জাতীয় পার্টি জয়ী হয় কিন্তু বিরোধীরা বয়কট করে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে এরশাদ পদত্যাগ করেন, যা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে। এই সময়ে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ না থাকলে সামরিক শাসন আরও দীর্ঘায়িত হতো, যা উক্তিটির সত্যতা প্রমাণ করে।
গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং দ্বিদলীয় দ্বন্দ্ব
১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়, যা বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জয়ী হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, এবং ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফেরে কিন্তু ২০০৬ সালে সহিংসতার কারণে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় (১/১১ সরকার), যা ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়ী করে। হাসিনার শাসনকাল ( ২০০৯-২০২৪ ) অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখায়, কিন্তু কর্তৃত্ববাদী বলে অভিযুক্ত হয়। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল হয়, এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো বিরোধীদের বয়কট এবং সহিংসতায় ভরা ছিল। ফ্রিডম হাউস ২০২২ সালে বাংলাদেশকে “হাইব্রিড রেজিম” বলে অভিহিত করে।
সাম্প্রতিক ঘটনা: ২০২৪ বিপ্লব এবং ২০২৬ নির্বাচন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন (জুলাই বিপ্লব) হাসিনাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে, যাতে ১,৪০০ জনের মৃত্যু হয় । হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান, এবং মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই সরকার ২০২৫ সালে জুলাই সনদ ঘোষণা করে, যা সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করে এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে হাসিনাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় (অনুপস্থিতিতে)। এই বিপ্লব দেখায় যে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করলে রাজনীতি মানুষকে টেনে নেয়,ছাত্ররা কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সরকার উল্টে দেয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও উত্তপ্ত, সীমান্ত সহিংসতা এবং বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞায়। ২০২৬ নির্বাচনের আগে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ (মুদ্রাস্ফীতি, আইএমএফ ঋণ) চলছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস দেখায় যে উদাসীনতা কর্তৃত্ববাদকে প্রশ্রয় দেয়, কিন্তু গণঅংশগ্রহণ পরিবর্তন আনে। যেমন ১৯৯০, ২০২৪। ২০২৬ নির্বাচন একটি সুযোগ, কিন্তু সংস্কার ছাড়া পুরনো চক্র ফিরে আসতে পারে। রাজনীতি করবেন, না হয় আপনাকে নিয়ে রাজনীতি করা হবে এই উক্তি
আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রাজনীতিতে সক্রিয় না হলে, রাজনীতি আমাদের নিয়েই খেলবে।
শিক্ষার্থী,
ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ
অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
লেখক ও কলামিস্ট