মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর–কিশোরগঞ্জ) আসনের নির্বাচনী মাঠ দিন যতই গড়াচ্ছে, ততই জটিল হয়ে উঠছে ভোটের হিসাব। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের পাশাপাশি শক্তিশালী একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণে এই আসনে গড়ে উঠেছে বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আপাতদৃষ্টিতে ত্রিমুখী লড়াই মনে হলেও বাস্তবে ভোটের সমীকরণ এখন অনেক বেশি অনিশ্চিত ও বিশ্লেষণসাপেক্ষ।
নির্বাচনী প্রচারণাকালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিককে স্থানীয় একটি অংশের ভোটারের সমর্থন পেতে দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে কার পাল্লা ভারী—তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং এলাকায় নিয়মিত উপস্থিতিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৫১ হাজার ৮১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৬ হাজার ৭২৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ২৫ হাজার ৮১৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন পাঁচজন। আসনটি ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ জোটের প্রভাববলয়ে থাকলেও এখানে অবাঙালি ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, যা ফলাফলে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা অনেকটাই হতাশ। নির্বাচনের সময় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তা পূরণ না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে এবার দলীয় পরিচয়ের চেয়ে এমন প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যিনি নির্বাচনের পরও এলাকায় থাকবেন, সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানো যাবে এবং বাস্তবভিত্তিক উন্নয়নে কাজ করবেন।
সৈয়দপুরে অবাঙালি জনগোষ্ঠীর ২১টি ক্যাম্প রয়েছে। এসব ক্যাম্পের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা একটি কমিটির সভাপতি মাজিদ ইকবাল বলেন, “আমরা এমন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি নিয়মিত এলাকায় থাকবেন, আমাদের কথা শুনবেন এবং সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।”
এই আসনের ফল নির্ধারণে তরুণ ভোটাররাও বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান সংকট, কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব এবং শিল্পায়নের ঘাটতির কারণে তরুণ সমাজ হতাশ। তারা আইটি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ক্ষুদ্র শিল্প এবং উদ্যোক্তা তৈরির বাস্তব পরিকল্পনা দেখতে চান।
তরুণ ভোটারদের ভাষ্য, শুধু স্লোগান নয়—যিনি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করবেন এবং এলাকায় থেকে কাজ করবেন, তাকেই তারা ভোট দেবেন।
দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল গফুর সরকার একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। তার শক্তির জায়গা সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয়তা।
তবে বিএনপির দুই মনোনয়নপ্রত্যাশী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় দলটির ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিএনপির একাধিক সমর্থক জানান, দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি তারা স্থানীয়ভাবে যিনি বেশি গ্রহণযোগ্য তাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরছেন। তার সমর্থকদের দাবি, অতীতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল এখনো মানুষ পাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব ও সুশাসনের বার্তা দিয়ে মাঠে রয়েছেন। বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ ও একটি অংশের তরুণ ভোটারের মধ্যে তার বক্তব্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষণে জানা গেছে।
তবে সব হিসাবকে ছাপিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী রিয়াদ আরফান সরকার রানা তরুণ ও অবাঙালি ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে নিজের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখছেন। তার বাবা সাবেক সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেন সরকার ভজে দীর্ঘদিন বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একাধিকবার পৌর মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় এলাকায় তার একটি সুদৃঢ় ভোটব্যাংক রয়েছে, যা এখন ছেলের পক্ষে কাজ করছে।
এ ছাড়া মোটরসাইকেল প্রতীকের প্রার্থী মামুন অর রশিদও তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। অনেক তরুণ ভোটারের ধারণা, স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হলে তিনি দলীয় চাপের বাইরে থেকে এলাকার উন্নয়নে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। এই বিশ্বাসই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতি আস্থা বাড়িয়ে তুলছে।
সব মিলিয়ে নীলফামারী-৪ আসনের নির্বাচনী লড়াই এখন কোনো একক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভোটারদের মনোভাব, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান এবং তরুণ ও অবাঙালি ভোটারদের ভূমিকা—সবকিছু মিলিয়ে এই আসনের ফলাফল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।