৩০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১১ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

সৈয়দপুরে শিল্প সংকট: ২৫০ কারখানা বন্ধ, কর্মহীন ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

ভারতের স্থলবন্দর-নির্ভর পোশাক রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও দীর্ঘদিনের পুঁজিসংকটের প্রভাবে নীলফামারীর সৈয়দপুরে ভয়াবহ শিল্প সংকট দেখা দিয়েছে। গত দুই বছরে এখানে রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস ও কারচুপি শিল্প খাতে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ২৫০টি কারখানা। এতে দুই শিল্প খাত মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

সৈয়দপুরের মুন্সিপাড়া এলাকায় অবস্থিত রপ্তানিমুখী খান অ্যান্ড সন্স পোশাক কারখানাটি ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান। কারখানাটিতে প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ শ্রমিক কাজ করতেন। তবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝুট কাপড়ের সরবরাহ কমে যায় এবং দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

একই সঙ্গে ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে পোশাক রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে ক্রয়াদেশ ব্যাপকভাবে কমতে থাকে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও কারখানাটি চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তীব্র আর্থিক সংকটে গত সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

সৈয়দপুরের রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস মালিক শিল্প সমিতির সভাপতি আকতার হোসেন খান জানান, ‘কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৪৭ জন শ্রমিক হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সবাই গভীর উদ্বেগে আছি।’

শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে সৈয়দপুর উপজেলায় ছোট-বড় ১০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ৭০টি স্থায়ীভাবে এবং ৩০টি অস্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন।

একই সময়ে সুতা ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী পুঁজিসংকটের কারণে উপজেলার প্রায় দেড়শ কারচুপি শিল্পকারখানা ও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আরও পাঁচ হাজারের বেশি দক্ষ কারিগর বেকার হয়ে পড়েছেন।

সৈয়দপুর এক্সপোর্টেবল স্মল গার্মেন্টস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (ইএসজিওএ) জানায়, পাকিস্তান আমল থেকেই সৈয়দপুরে ঝুট কাপড়ভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের ঐতিহ্য রয়েছে। ২০০২ সালের পর এ শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম থেকে সংগৃহীত ঝুট কাপড় ব্যবহার করে এখানে ট্রাউজার, শর্টস, জ্যাকেট, টি-শার্ট ও জিনস উৎপাদন করা হতো। এসব পোশাকের প্রধান রপ্তানি বাজার ছিল ভারত, নেপাল ও ভুটান।

ইএসজিওএর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত বছরের ১৭ মে এক আদেশে সিদ্ধান্ত নেয়, তৈরি পোশাক শুধু কলকাতা সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আমদানি করা যাবে। এর ফলে স্থলবন্দরনির্ভর রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। আগে সৈয়দপুর থেকে বেনাপোল, সোনামসজিদ ও সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে পোশাক রপ্তানি হতো। সে ক্ষেত্রে এক চালানে গড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হলেও বর্তমানে কলকাতা সমুদ্রবন্দর দিয়ে রপ্তানিতে খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা।

রপ্তানিকারকেরা জানান, টিকে থাকার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনেও সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে চলতি বছরে সৈয়দপুর থেকে ভারতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ ডলার, যা আগের কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম।

অন্যদিকে, সৈয়দপুরের ঐতিহ্যবাহী কারচুপি শিল্পও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলে গড়ে ওঠা তিন শতাধিক কারচুপি কারখানায় কাঠের ফ্রেমে শাড়ি, পাঞ্জাবি, ওড়না ও বিভিন্ন পোশাকে নকশার কাজ করতেন প্রায় ১০ হাজার নারী-পুরুষ। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের একটি বড় অংশ এখন জীবিকা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

শহরের রসুলপুর এলাকার বাসিন্দা রোজিনা বেগম জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর কারচুপি কারখানায় কাজ করেই তিনি সংসার চালাতেন। সম্প্রতি ওই কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

শিল্প উদ্যোক্তারা মনে করছেন, দ্রুত নীতিগত সহায়তা, বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা এবং স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা না হলে সৈয়দপুরের শ্রমনির্ভর এই দুটি শিল্প খাত পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top