মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
মানবতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমাজের অবহেলিত ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক উজ্জ্বল নাম—পরিবাবু পরি। নিজের ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসার উপার্জন ও সংগ্রহ করা অনুদানের অর্থে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এই মানবিক স্বেচ্ছাসেবক।
এরই ধারাবাহিকতায় নীলফামারী সদর উপজেলার ৯ নং ইটাখোলা ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড পাটোয়ারী পাড়া গ্রামে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি পরিবারের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকাল ৩টায় আয়োজিত এই কর্মসূচিতে আগুনে পুড়ে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান পরিবাবু পরি।
জানা যায়, সম্প্রতি বিদ্যুতের শর্টসার্কিটের কারণে ওই এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কয়েকটি পরিবার বসতঘর ও সহায়-সম্বল হারিয়ে চরম মানবিক সংকটে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবাবু নিজের ব্যবসার অর্থ ব্যয় করে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাতে তা তুলে দেন।
শীতবস্ত্র পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকেই। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বৃদ্ধা নারী কৃষ্ণা রানি(৭০) কাঁপা কণ্ঠে বলেন, “আগুনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। এই বয়সে কেউ এসে নতুন কাপড় দেবে—ভাবতেই পারিনি। আল্লাহ যেন এই ছেলেটাকে ভালো রাখেন।”
নতুন পোষাক পেয়ে আরেক বিধবা নারী আলিমননেছা(৬৫) বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর আমাদের কেউ খোঁজ নেয় না। আজ শীতবস্ত্র পেয়ে মনে হলো—আমরাও সমাজের মানুষ।”
পরিবাবু পরি বলেন, “আমি নিজেও ছোট কাপড়ের ব্যবসা করি। মানুষের কষ্ট দেখলে নিজের কষ্ট ভুলে যাই। অনেক সময় মানুষের কাছে চেয়ে সাহায্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কথা শুনতে হয়, তবুও থেমে যাই না। অসহায় মানুষের মুখে একটু হাসি দেখলেই আমার সব পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।”
পরিবাবুর এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে স্থানীয় সমাজকর্মী মো. আব্দুল হাকিম বলেন, “বর্তমান সমাজে যখন অনেকেই শুধু নিজের কথাই ভাবছে, তখন পরিবাবুর মতো তরুণরা নিঃস্ব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার প্রকৃত উদাহরণ সৃষ্টি করছেন। এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।”
ইটাখোলা ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের সদস্য সৈয়দ আলী বলেন, “অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পরিবাবুর এই সহায়তা শুধু শীতবস্ত্র নয়, বরং মানসিক শক্তি যোগাবে। আমরা চাই সমাজে আরও পরিবাবু তৈরি হোক।”
নীলফামারী সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও গোড়গ্রাম ইউনিয়নের প্রশাসক মো. আলমগীর হোসেন বলেন— “মানবিকতা যে এখনো আমাদের সমাজে জীবন্ত—পরিবাবুর কাজ তা আবারও প্রমাণ করেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে রামগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে তার একটি পোশাক বিতরণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে গিয়ে শুধু একটি আয়োজন নয়, বরং একজন মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক চেতনার বাস্তব প্রতিফলন প্রত্যক্ষ করেছি।
তিনি বলেন, অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সীমিত সামর্থ্য নিয়েও পরিবাবু যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার ঊর্ধ্বে। কোনো প্রচার নয়, কোনো প্রত্যাশা নয়—শুধু মানুষের জন্য মানুষ হয়ে দাঁড়ানোর এই মানসিকতা আমাদের সবার জন্য অনুকরণীয়।
তিনি আরও বলেন, সেদিনের আয়োজন আমাকে গভীরভাবে অভিভূত করেছে। এমন মানবিক উদ্যোগ সমাজে আশা ও আলো জাগায়। প্রিয় পরিবাবু—আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ, আপনার এই মানবতার পথচলা আরও দীর্ঘ ও সফল হোক।”
কোনো প্রচার বা স্বীকৃতির প্রত্যাশা ছাড়াই নিছক মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করে যাচ্ছেন পরিবাবু পরি। স্থানীয়দের মতে, তার এই উদ্যোগ মানবতার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।