১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৩ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

সৈয়দপুরে অবাঙালি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে উর্দুতে নির্বাচনী প্রচারণা

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে ভোট প্রচারণায় যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষায় মাইকিং করে ভোট প্রার্থনা করছেন একাধিক প্রার্থী। শহরের বিভিন্ন এলাকায় উর্দু ভাষায় প্রার্থীর পরিচয়, প্রতীক (মার্কা) উল্লেখের পাশাপাশি গান ও গজল পরিবেশন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সৈয়দপুরে বসবাসরত সংখ্যাগরিষ্ঠ উর্দুভাষী (বিহারি) ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, শহরের উর্দুভাষী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে গত কয়েক দিন ধরে উর্দু ভাষায় প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে। প্রার্থীদের দাবি, উর্দুভাষী ভোটারদের কাছে সহজ ও সরাসরি বার্তা পৌঁছাতে এই ভাষায় মাইকিং কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এতে ভোটাররা প্রার্থীর নাম, প্রতীক ও নির্বাচনী বার্তা সহজে বুঝতে পারছেন।

তবে উর্দু ভাষায় প্রচারণাকে ঘিরে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একাংশের মতে, এটি ভাষাগত বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির দৃষ্টান্ত। অন্য একটি অংশ মনে করছে, এই উদ্যোগ ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সমালোচকদের ভাষ্য, পাকিস্তান আমলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে পাশ কাটিয়ে উর্দুতে মাইকিং করা অনেকের অনুভূতিতে আঘাত দিচ্ছে।

অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, উর্দুভাষীরাও বাংলাদেশের নাগরিক ও ভোটাধিকারপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী। ফলে তাদের মাতৃভাষায় ভোট প্রার্থনা করায় কোনো সাংবিধানিক বা নৈতিক বাধা নেই। বরং এতে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

এ বিষয়ে উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজেদ ইকবাল বলেন, “উর্দুভাষীরাও এখন এই দেশের নাগরিক। আমরা ভোটাধিকার পেয়েছি, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নানা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নির্বাচন এলেই উন্নয়নের আশ্বাস দেওয়া হয়—বাড়ি, রাস্তা ও জীবনমান উন্নয়নের কথা বলা হয়; কিন্তু বাস্তবে খুব কমই তা বাস্তবায়ন হয়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন হলেও আমাদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। তবুও আমরা আশাবাদী। দেশে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। যারা জনপ্রতিনিধি হবেন, তারা যেন উর্দুভাষীদের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তব ও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৈয়দপুরের মতো ভাষাগতভাবে বৈচিত্র্যময় এলাকায় ভোট রাজনীতিতে ভাষা একটি কৌশলগত উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক সংবেদনশীলতা বিবেচনায় রেখে দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। অন্যথায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগই বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

এ বিষয়ে সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিলা বলেন, অবাঙালি উর্দুভাষী মুসলিম ভোটারদের আকৃষ্ট করতে উর্দু ভাষায় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালানোর বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে উপজেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও জানান, নির্বাচনসংক্রান্ত ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি একটি নীতিগত ও কমিশননির্ভর সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে চূড়ান্ত ও সুস্পষ্ট তথ্য জেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকেই পাওয়া যাবে, কারণ তারাই নির্বাচন কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিষয়টি সমন্বয় ও বাস্তবায়ন করে থাকে।

নির্বাচনী প্রচারণায় উর্দু ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা প্রসঙ্গে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, “অবাঙালি উর্দুভাষী মুসলিম ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় উর্দু ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা, নীতিমালা বা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। ফলে প্রচলিত নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধির আওতায় থেকে প্রার্থীরা নিজ নিজ কৌশলে ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছাতে পারবেন।”

সব মিলিয়ে সৈয়দপুরে উর্দু ভাষায় মাইকিং নির্বাচন-পূর্ব রাজনীতিতে ভাষা, পরিচয় ও ভোট কৌশলের জটিল সমীকরণকে নতুন করে সামনে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, এই কৌশল ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলে এবং নির্বাচনের পর উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নে কতটা অগ্রগতি আসে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top