২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৪ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

পোস্টারবিহীন নির্বাচন ভরা মৌসুমেও কাজ নেই, হতাশ নীলফামারীর ছাপাখানা শ্রমিকরা

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও নীলফামারীর ছাপাখানা শিল্পে নেই সেই চিরচেনা ব্যস্ততা। নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী এবার পোস্টারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভরা মৌসুমেও কাজ না থাকায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন জেলার ছাপাখানা মালিক ও শ্রমিকরা।

অতীতের প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে পোস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ব্যানার ও ফেস্টুন ছাপাতে দিন-রাত ব্যস্ত থাকত জেলার ছাপাখানাগুলো। অনেক ক্ষেত্রে নির্ঘুম রাত কাটাতে হতো মিস্ত্রি ও শ্রমিকদের। কিন্তু এবার পোস্টার ছাপায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় পুরো চিত্রটাই বদলে গেছে।

নীলফামারী শহরসহ সৈয়দপুর, ডোমার, ডিমলা, জলঢাকা ও কিশোরগঞ্জ উপজেলায় গড়ে ওঠা ছোট-বড় মিলিয়ে কয়েক ডজন ছাপাখানায় কাজের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বহু প্রতিষ্ঠানে দিনের পর দিন মেশিন বন্ধ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

নীলফামারী জেলা শহরের ছাপাখানা মিস্ত্রি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “নির্বাচনের সময়টাই ছিল আমাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। পোস্টারের কাজ থাকলে দিন-রাত এক করে কাজ করতাম। এবার কাজ না থাকায় সংসার চালানোই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

একই সুরে কথা বলেন প্রিন্টিং শ্রমিক আব্দুল মালেক। তিনি বলেন, “নির্বাচনের সময় অতিরিক্ত যে আয় হতো, সেটাই আমাদের বড় ভরসা ছিল। পোস্টার ছাপা বন্ধ হওয়ায় সেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।”

দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক সোহেল রানা জানান, “কাজ না থাকলে আমাদের কোনো রোজগার নেই। পোস্টার না থাকায় ছাপাখানায় কাজ একেবারেই নেই।”

হাবিবা ডিজিটাল সাইন প্রিন্টিং প্রেসের এক প্রতিনিধি বলেন, “নির্বাচন এলেই আমাদের কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যেত। পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন—সব মিলিয়ে এই সময়টাই ছিল মূল আয়ের মৌসুম। কিন্তু পোস্টারবিহীন নির্বাচনের কারণে এবার সেই সুযোগ পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। দোকানে কর্মচারীরা বসে থাকছে, বিদ্যুৎ বিল ও ভাড়া পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ডিজিটাল প্রচারণা বাড়লেও স্থানীয় ছাপাখানাগুলোর জন্য কার্যকর কোনো বিকল্প নেই।”

হাকিম কম্পিউটার অফসেট প্রেসের মালিক জানান, “আগে নির্বাচন মানেই ছিল আমাদের জন্য ব্যস্ত সময়। পোস্টার ছাপানো, লিফলেট ও দেয়াল লিখনের কাজ করে অনেক পরিবারের সংসার চলত। এবার পোস্টার না থাকায় সেই আয় একেবারেই বন্ধ। মেশিন বসে আছে, শ্রমিকদের নিয়মিত কাজ দিতে পারছি না। আমরা পরিবেশবান্ধব নির্বাচনের বিপক্ষে নই, তবে শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বিকল্প দিকনির্দেশনা বা সহায়তা দরকার।”

ছাপাখানা মালিকদের মতে, পোস্টারবিহীন নির্বাচন পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর ফলে ক্ষুদ্র শিল্প ও শ্রমজীবীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিকল্প কর্মসংস্থান বা প্রণোদনার ব্যবস্থা না থাকলে অনেক ছাপাখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

অন্যদিকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিষয়টিকে দেখছেন দ্বিমুখী দৃষ্টিতে। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক (অব.) আব্দুস সালাম বলেন,
“পোস্টারবিহীন নির্বাচন পরিবেশ ও নগর সৌন্দর্য রক্ষায় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শ্রমিকদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা জরুরি ছিল।”

সমাজকর্মী ছবি রানী বলেন, “নির্বাচনের সময় পোস্টারে শহরজুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো। পোস্টারবিহীন প্রচারণা ইতিবাচক হলেও যাদের জীবিকা এ খাতের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিষয়টি উপেক্ষা করা ঠিক নয়।”

নীলফামারী জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ আলম বলেন, “ডিজিটাল ও সীমিত প্রচারণা আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থার অংশ। তবে এই রূপান্তরের সময় ক্ষতিগ্রস্ত পেশাজীবীদের পাশে রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে।”

উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অতিরিক্ত পোস্টার ও ব্যানার ব্যবহারে পরিবেশ দূষণ, সড়ক দখল এবং নগর জীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ থাকায় এবার পোস্টার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রার্থীদের ডিজিটাল ও সীমিত আকারে প্রচারণার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, পোস্টারবিহীন নির্বাচন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসিত হলেও নীলফামারীর ছাপাখানা শিল্পে তৈরি করেছে গভীর অনিশ্চয়তা ও জীবিকার সংকট—যার প্রভাব পড়ছে মালিক ও শ্রমিক উভয়ের ওপর।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top