মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
ভোক্তাদের আশঙ্কা, অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় রমজান শুরু হওয়ায় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। রমজান এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জেলার বিভিন্ন কাঁচাবাজারে ফল, ভোজ্যতেল, সবজি, খেজুর, ছোলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা, বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ। ভোক্তাদের আশঙ্কা, অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় রমজান শুরু হওয়ায় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এদিকে, ইফতারে শরবত তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ লেবু এখন বিক্রি হচ্ছে ‘সেঞ্চুরি’ দরে।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর, নারুয়া, জামালপুর, আড়কান্দি, সোনাপুর, রামদিয়া, বালিয়াকান্দি হাটবাজার, রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাণিবহ, মাটিপাড়া, নতুনবাজার, বড়বাজার, খানখানাপুর, আহলাদিপুর, বসন্তপুর, কোলারহাট, গোয়ালন্দ উপজেলার কাটাখালী, গোয়ালন্দ বাজার, দৌলতদিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বড় লেবুর দাম হালিতে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগেও বড় লেবুর হালি ছিল ৩০-৪০ টাকার মধ্যে, আর মাঝারি লেবুর দাম ছিল ১৫-২০ টাকা। বর্তমানে মাঝারি লেবুর হালি বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়।
বহরপুরের সবজি ব্যবসায়ী নুর আলী বলেন, “বর্তমানে লেবুর ভরা মৌসুম নয়। গাছে নতুন ফুল এসেছে এবং ছোট ফল ধরছে, ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। যেসব গাছে সারা বছর কিছু লেবু পাওয়া যায়, সেখানকার ফলই এখন বাজারে আসছে। সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।” তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন উপলক্ষে গত কয়েক দিন পরিবহন চলাচল সীমিত ছিল, যার প্রভাব বাজারে পড়েছে। দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য সময়মতো বাজারে না পৌঁছালে সরবরাহ কমে যায়, এতে দাম বেড়ে যায়।” ব্যবসায়ীদের মতে, এটি সাময়িক পরিস্থিতিড়মৌসুম শুরু হলে দাম আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। হাটে বাজার করতে আসা গৃহিণী শারমিন আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুনি অন্যান্য দেশে রমজান আসতে শুরু করলে দাম কমে যায়, কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র দেখা যায়। দুই দিন গাড়ি একটু কম চলছে দেখেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সুযোগ খোঁজে কখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাতে দাম বাড়াতে পারে।” এদিকে শীতের শেষ মৌসুমে অধিকাংশ সবজির দাম বেড়েছে। পেঁপে আগে ১৫ টাকা থাকলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ২৫ – ৩০ টাকায়। করলা ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে। ঢেঁড়স ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি দরে। গোল বেগুন ৬০ টাকা এবং শসা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রমজানে জনপ্রিয় ইফতারি ‘বেগুনি’ তৈরিতে ব্যবহৃত লম্বা বেগুনের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে এখন ৬০ টাকা, যা আগে ছিল ৪০ টাকা। অন্যদিকে লাউয়ের দাম কমে ৫০ টাকা থেকে ৪০ টাকায় নেমেছে। টমেটোও ৫০ টাকা থেকে কমে এখন ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা কেজি, ফুলকপি ৩০ টাকা এবং শিম ৪০-৬০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে বেড়েছে গরুর মাংস ও মুরগির দাম। কিছুদিন আগেও সোনালী মুরগি ২৮০ টাকা থাকলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা কেজি দরে। গরুর মাংস ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের মধ্যে রুই, শিং ও কই মাছের দাম কেজিতে ২৫-৩৫ টাকা বেড়েছে। তবে অন্যান্য মাছের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। এদিকে একদিন আগেও ৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকায়। দেশি রসুনের দাম ৯০-১০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ টাকায়, আর চায়না রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। আদার বাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে ড়ায়না আদা ১৬০ টাকা এবং দেশি আদা ১৩০-১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেড়েছে খেসারির ডালের দাম। আগে ৮৫-৯০ টাকা থাকলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। তবে অন্যান্য ডালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। মুগ ডাল ১৮৫ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১৪০ টাকা এবং ছোলা ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে চিনি ১১০ টাকা, বেসন ৯০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ইসবগুলের ভুষি ১০০ গ্রাম ১৫০ টাকা এবং ডাবলি বুট ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পোলাওয়ের চালের দামও বেড়েছে। আগে ১৩৫ টাকা থাকলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। তবে অন্যান্য চালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। মিনিকেট চাল ৮০ টাকা, আটাশ চাল ৭০ টাকা, কাজললতা চাল ৭৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভোজ্যতেলের মধ্যে খোলা সয়াবিন তেল ২১০ টাকা এবং খোলা সরিষার তেল ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খেজুরের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০-১০০ টাকা, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ধরনভেদে খেজুরের দাম প্রতি কেজি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রমজানে খেজুরের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এ কারণে গত ডিসেম্বর খেজুর আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এতে আমদানি বাড়বে এবং দাম কমবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে বাজারে দাম উল্টো বেড়েছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে জাহিদী খেজুর, যার দাম কেজিতে ২৮০ টাকা, এক সপ্তাহ আগেও এটি ছিল প্রায় ২৫০ টাকা। অন্যান্য খেজুরের মধ্যে বড়ই ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা, দাবাস ৫০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মরিয়ম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খেজুরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে দাবাস ও কালমি জাতের। দাবাসের দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে ৪৫০-৫০০ টাকা হয়েছে এবং কালমি ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলের দামও বাড়তি রমজান শুরুর দু’দিন বাকি থাকতেই নানা অজুহাতে বিভিন্ন ফলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচন ও রমজানকে ঘিরে চাহিদা বাড়ায় ফলের দাম বেড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আপেল বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ২৬০ থেকে ৩৫০ টাকা, কমলা ২৪০ থেকে ৩৫০ টাকা, মাল্টা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, সাদা আঙুর ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা, কালো আঙুর ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং আনার ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে স্থান ও আকারভেদে দামের পার্থক্য দেখা গেছে।
রাজবাড়ী, খানখানাপুর, সোনাপুর, বালিয়াকান্দি ও বহরপুরের কয়েকজন ফল ব্যবসায়ীর সাথে কথা বললে তারা বলেন, “রমজান সামনে রেখে ফলের আড়তে কিছুটা দাম বাড়ানো হয়েছে, তাই খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে অনেক পণ্য সময়মতো আসতে পারেনি, এটিও দাম বাড়ার একটি কারণ।”