সোহরাব, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
টানা ছয় বছর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে নাজির পদে আসিন ছিলেন জামাল উদ্দিন। এ ছয় বছরে বনে গেছেন অঢেল সম্পদের মালিক। বেতন ৩০ হাজার টাকার হলেও তিনি থাকেন দেড় কোটির ফ্ল্যাটে। নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মুখোমুখি হয়েছেন বেশ কয়েকবার। দুদকের তদন্তে মিলেছেও অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণও। পেশায় সরকারি কর্মচারী হলেও কোন নিয়মেরই তোয়াক্কা করতেন না তিনি। সরকারি চাকরীবিধি তার কাছে মামুলি ব্যাপার। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে তিনি ছিলেন এক অলিখিত ডিসি। দেশের প্রথম সারির প্রায় সবকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তার অনিয়ম দুর্নীতির খবর।
এসব অভিযোগের পর জামালের রাজত্বের সমাপ্তি হয় গেল বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নাজির থেকে তাকে বদলি করা হয় নোয়াখালী জেলার কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। কিন্তু চারমাস যেতে না যেতেই ফের জামাল উদ্দিন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে বদলি হয়ে এসেছেন। এ নিয়ে চলছে নানা সমালোচনা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের আমলে ব্যাপক দাপুটে রাজত্ব করেছেন জামাল উদ্দিন। আওয়ামী লীগের দুই মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার কথায় যেন অলিখিত আইন ছিল। নানা দুর্নীতির অভিযোগে ছয় বছর পর তাকে বদলি করা হয় নোয়াখালীতে। নতুন সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই জামাল আবারও জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে বদলি হয়ে এসেছেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের বদলির সাত দিন পর ২৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দপ্তরের নানা অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে তিন কর্মচারীকে বদলি করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নূরী স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাদের বদলি করা হয়। এর মধ্যে জেলা প্রশাসনের নাজির মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনকে নোয়াখালী জেলার কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। এছাড়া সার্টিফিকেট শাখার উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাশকে খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন চৌধুরীকে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
জেলা প্রশাসনে চাউর আছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের নাজির জামাল উদ্দিন সবকিছুর অঘোষিত হর্তাকর্তা। তার ইশারায় চলতো সকল অনিয়ম, ঘুষ লেনদেন। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর তিনি সার্কিট হাউজে লুকিয়ে থাকলেও কিছুদিন আবারও প্রকাশ্যে আসেন। হাসিনাকে অন্তর লালন করা জুলাই বিরোধী এই কর্মচারী ৫ আগস্টের পরও দাপিয়ে বেড়ান জেলা প্রশাসনে। এতদিন তাকে বদলিতো দূরের কথা উল্টো ধারাবাহিতকার অংশ হিসেবে সম্প্রতি বদলি হওয়া চট্টগ্রামের ডিসি ফরিদা খানমের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন তিনি।
অভিযোগ ওঠেছে, মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন জুলাই আন্দোলনে সময় আওয়ামী লীগের কর্মীদের খাবার সরবরাহ করতেন। তাছাড়া টাকা ঢেলেছেন তিনি। সরকার পতনের পর তার বিরুদ্ধে আদালত অঙ্গনে পোস্টারে সাঁটান ভুক্তভোগীরা। এতে তার গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করা হয়।
এতোকিছুর পরও জামাল উদ্দিন বহাল তবিয়তে ছিলেন নাজির পদে। এ পদে থেকে সব তদবির বাণিজ্য, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, ইজারা/লিজ বাণিজ্য, ভূমি জালিয়াতি, শ্রেণি পরিবর্তন কারবার চালাতেন তিনি। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে তহসিলদারদের বদলি ও অফিস সহায়কদের বদলি তিনি হ্যাণ্ডেল করতেন ঘুষের বিনিময়ে। জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায়ও ছিল তার নিয়ন্ত্রণ।
জেলা প্রশাসন তথ্য ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাত্র ৩০ হাজার টাকা বেতন হলেও জামাল থাকেন দেড় কোটি টাকা মূল্যের ডাবল ফ্ল্যাটে। জীবনযাপন ও আয়েশি জামালের। ২০০৫ সালে জেলা প্রশাসনে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে যোগ দিয়ে চাকরি শুরু করেন তিনি। আর দুই দশকে জামাল এখন সম্পদের কামাল। নগরের কোর্ট রোড় এলাকায় কেসি দে গ্রাণ্ড ক্যাসেল ভবনের চতুর্থ তলায় দুই হাজার ৬৫ বর্গফুটের ফোর সি ও ফোর ডি দুটি ফ্ল্যাটে থাকেন জামাল ও তার পরিবার। যার বর্তমানে মূল্য দেড় কোটির বেশি। তবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি ৮৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকায় ফ্ল্যাট দুটে ডেভেলফমেন্ট কোম্পানি ডি ডেভেলফমেন্ট থেকে কেনেন বলে জানা গেছে।
অফিস সহকারী হিসেবে চাকরিতে ঢুকলেও বিভিন্ন ভূমি অফিস ঘুরে ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর জামাল জেলা নাজিরের পদ ভাগিয়ে নেন। এই পদে নিতে তার বিরুদ্ধে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও জৈষ্ঠ্যতা লঙ্গনের অভিযোগ আছে। অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের কাছে জেলা প্রশাসনের কর্মচারীরা একটি অভিযোগ দিয়েছেন যে দীর্ঘদিন ধরে তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকে ১৫-১৬ বছর ধরে পছন্দের পদে পছন্দের অফিসে ছিলেন। অবশেষে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিনের সততা ও নিরপেক্ষতার কারণে এসব অভিযুক্ত কর্মচারীদের দীর্ঘদিন পর বদলি করার সুযোগ হয়েছে। এতে খুশি হয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
মূলত নাজির পদেই বসেই সম্পদের মালিক হতে শুরু করেন তিনি। সম্প্রতি দুদকেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়েছে। এরআগে দুদক হিসেব চাইলে জামাল উদ্দিন বহু সম্পদ গোপন করে মাত্র ১৩ লাখ ৭৬ হাজার স্থাবর ও ২২ লাখ ৮৬ হাজার অস্থাবর সম্পদের হিসাব দেয়। তার স্ত্রী রুনা আক্তারের মাত্র ৫৫ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব দেন। তবে চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৪ এ জামালের আয়কর রিটার্ন অনুসারে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র অর্ধকোটির সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেন। বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় তিনি আত্মীয় স্বজনদের নামে বিনিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ আছে। বাস্তবে তার সম্পদের পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি।
এসবের বাইরে তার গ্রামের বাড়ি চন্দনাইশের গাছবাড়িয়ায়ও রয়েছে নামে-বেনামে সম্পদ। সেখানকার কলেজ গেটে তার স্ত্রীর নামে একাধিক দোকান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেন আটজন আইনজীবী। তাদের দেওয়া অভিযোগপত্রে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে জামাল উদ্দিনের ব্যাংক হিসাব জব্দ, বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে বিভাগীয় কার্যধারা শুরুর আবেদন করা হয়েছে। এছাড়াও নাজির পদ থেকে তাকে দ্রুত অপসারণ করে নতুন নাজির পদায়নের দাবি জানান তারা।
অভিযোগকারী আইনজীবীরা হলেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এম শফিকুল আলম, আজিমউদ্দিন পাটোয়ারী, ইয়াছিন আলফাজ, মহি উদ্দীন, নাদিম মাহমুদ, সৈয়দ ওয়াহিদ, সাইফুল্লাহ খালেদ ও শামীম পাটোয়ারী। অ্যাডভোকেট এম শফিকুল আলম আমার দেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে ১৪তম গ্রেডের এই কর্মচারীর মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ভবিষ্যৎ তহবিলে কাটা যায় ৫ হাজার ২০০ টাকা। তবুও স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি থাকছেন নগরীর কোর্ট রোডে দেড় কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাটে।
এছাড়া, সাবেক জেলা প্রশাসক আবুল বশর মো. ফখরুজ্জামান ও মোমিনুর রহমানের প্রভাব ব্যবহার করে গত ৪-৫ বছরে অন্তত ৪০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
আইনজীবীরা তাদের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, দুদক আইন ২০০৪ অনুযায়ী এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান শুরু করতে হবে।
একইসঙ্গে অভিযুক্ত যেন বিদেশে পালাতে না পারেন, সেজন্য আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মুজিব বন্দনায়ও সবার চেয়ে এগিয়ে তিনি
জামাল চরম পর্যায়ের মুজিব বন্দনা করতেন। দুদকে জমা দেওয়া আইনজীবীরা আবেদনে বলেন, জামাল উদ্দিন বিভিন্ন আওয়ামী চ্যানেল ও পত্রিকা ভাড়া করে মুজিবকে নিয়ে বক্তব্য দিতেন। আওয়ামী লীগের মন যুগিয়ে বদলির হাত থেকে বাঁচতেন তিনি। তাছাড়াও আওয়ামী লীগের মহানগর ও দক্ষিণ জেলার নেতাদের সাথে তার ছিল হরহামেশা যোগাযোগ।
মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে জামালের দেওয়া এক ভিডিও আমার দেশের হাতে এসেছে। সেখানে জামাল উদ্দিন বলেন, শেখ মুজিবকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে দিনের পর দিন চলে যাবে। এসময় তিনি শেখ হাসিনার বন্দনা করেন নানাভাবে। ৪১ সালের ভিশনের সাথে একমত হয়ে তিনি শেখ হাসিনাকে ততদিন পর্যন্ত দেখতে চান। এমনকি হাসিনার মতো ভালো নেতৃত্ব পৃথিবীর ইতিহাসে আর আসবে না এবং নেই বলেও মন্তব্য করেন জামাল।
তার সহকর্মীরা জানান, জামাল কোন কর্মকর্তা না হলেও সবসময় কর্মকর্তা ভাব নিয়ে থাকেন। তার সব কার্যক্রম চাকরীবিধির লঙ্গন।