মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারী জেলার ডিমলায় তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের তথ্যচিত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক। আহতরা হলেন—ডিমলা উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক বাদশা প্রামাণিক (৫০) এবং সাংবাদিক নুর মোহাম্মদ (৩৫)।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় প্রাঙ্গণে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলায় দুই সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। হামলার সময় সাংবাদিকদের ব্যবহৃত ক্যামেরা ও দুটি স্মার্ট মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট থানায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি। তবে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ডিমলা উপজেলা প্রেসক্লাব, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, নীলফামারী প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন। তারা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
হামলার বিষয়ে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম শাহিন বলেন, “ঘটনার সময় আমি ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত ছিলাম না। পরে পরিষদে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সাংবাদিকদের ওপর হামলার সত্যতা পাওয়া গেছে।”
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদী এলাকা থেকে আব্দুল করিমের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সরকারি বিধি-বিধান উপেক্ষা করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে আসছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার পাশাপাশি নদীর তলদেশে বসানো হয়েছে একাধিক শক্তিশালী ‘সিক্স সিলিন্ডার বোমা মেশিন’। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশ্য দিবালোকে নদীর তলদেশে গভীর খাদ সৃষ্টি করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।
এই অনিয়মের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহে সাংবাদিকরা সরেজমিনে গেলে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. মতিয়ার রহমানের ছেলে আব্দুল করিম (৪০) এবং একই গ্রামের শিক্ষক ডাবলুর ছেলে তানজিরুল ইসলাম তুহিন (২৫) ক্ষিপ্ত হয়ে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে বেধড়ক মারধর করেন এবং ব্যবহৃত ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, সীমান্ত ফাঁড়ি এলাকা, তেলির বাজার, চরখড়িবাড়ি, বাইশপুকুর ও সুপারিটারীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত ১৫টির বেশি বোমা মেশিন দিয়ে দিন-রাত পাথর উত্তোলন চলছে। এর ফলে নদীর তলদেশে সৃষ্টি হয়েছে গভীর গর্ত। গত বর্ষা মৌসুমে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টিতে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দেয়। এতে বহু আবাদি জমি, বসতভিটা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড–এর ডালিয়া শাখা তিস্তা নদীর ডান তীর সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ভাঙনরোধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সম্প্রতি সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরক্ষা কাজ সম্পন্ন হলেও নদীর ভেতরে অবাধ পাথর উত্তোলনের কারণে এসব সরকারি প্রকল্প মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, “রাতের আঁধারে বোমা মেশিন বসিয়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এটি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান অত্যন্ত জরুরি।”
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করা হবে।”
এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানান, “বোমা মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে যৌথ অভিযান পরিচালিত হবে।”
তিস্তাপাড়ের মানুষের জোরালো দাবি—অবিলম্বে বোমা মেশিন উচ্ছেদ, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং স্থায়ীভাবে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় নদীভাঙন ও পরিবেশ বিপর্যয়ে তিস্তাপাড়ের জনজীবন আরও ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে।