এম. আজগর সালেহী:
জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বহু স্থানে সালাতের সাথে জাকাতের কথা একত্রে উল্লেখ করেছেন, যা এর অপরিসীম গুরুত্বকে নির্দেশ করে। জাকাত কেবল একটি আর্থিক ইবাদত নয়, বরং এটি সমাজের দারিদ্র্য দূরীকরণ, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং মানবিক সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার এক মহান ব্যবস্থা।
জাকাত ফরজ হওয়ার বিধান সম্পর্কে কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা সালাত কায়েম করো এবং জাকাত দাও।”
(সূরা বাকারা: ৪৩)।
অর্থাৎ, যার কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ রয়েছে এবং সেই সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হয়েছে, তার ওপর জাকাত ফরজ হয়ে যায়।
জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের একটি নির্ধারিত পরিমাণ রয়েছে, যাকে নিসাব বলা হয়।
স্বর্ণের ক্ষেত্রে প্রায় সাড়ে সাত ভরি (৮৭.৪৮ গ্রাম) এবং রূপার ক্ষেত্রে প্রায় সাড়ে বায়ান্ন ভরি (৬১২.৩৬ গ্রাম) সমপরিমাণ সম্পদ থাকলে জাকাত ফরজ হয়।
নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য, সঞ্চয়, বিনিয়োগ সব মিলিয়ে নিসাব পরিমাণ সম্পদ হলে এবং তা এক বছর স্থায়ী থাকলে মোট সম্পদের ওপর ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত দিতে হয়।
জাকাত মূলত দরিদ্র বিমোচনের উত্তম পন্থা। ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনে জাকাতকে এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে সমাজে সম্পদের একচেটিয়া জমাট বাঁধা না ঘটে এবং ধনী-গরিবের বৈষম্য কমে আসে। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে দরিদ্রতা দূর করা সম্ভব, কারণ এতে ধনীদের সম্পদের একটি অংশ নিয়মিতভাবে দরিদ্র, বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং তাদের জীবনে স্বাবলম্বিতা সৃষ্টি হয়।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তাদের সম্পদে রয়েছে নির্ধারিত অধিকার—প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের জন্য।”
(সূরা মাআরিজ: ২৪–২৫)।
এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে মানুষের সম্পদে শুধু তার নিজের অধিকার নয়, বরং আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও অভাবগ্রস্ত মানুষেরও হক রয়েছে। তাই জাকাত আদায় করা কেবল দয়া নয়, বরং এটি একটি ফরজ দায়িত্ব এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম।
জাকাত কোন কোন খাতে দেওয়া যায় তা কোরআনে নির্ধারিত আছে। আল্লাহ বলেন:
“জাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত কর্মচারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা হয়, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য।”
(সূরা তাওবা: ৬০)।
এই আটটি খাতের সামাজিক বাস্তবতা মিলালে আমরা বুঝি-
১। ফকির (যাদের কোনো সম্পদ নেই বা অতি সামান্য আছে)।
২। মিসকিন (অভাবগ্রস্ত কিন্তু ভিক্ষা করে না)।
৩। জাকাত সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারি বা বেসরকারি নির্ভরযোগ্য কর্মচারী।
৪। নওমুসলিম। ইসলামে দীক্ষিত করার ক্ষেত্রে বা নওমুসলিমদের পুনর্বাসন করার জন্য।
৫। দাসমুক্তির কাজে (বর্তমানে বন্দি মুক্তি বা অনুরূপ মানবিক প্রয়োজনে)।
৬। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, যারা বৈধ কারণে ঋণে জর্জরিত।
৭। আল্লাহর পথে ব্যয় (জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ, দ্বীনের খেদমত ও কল্যাণমূলক কাজে)
৮। মুসাফির বা পথিক, যারা সফরে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে যার ফলে সাহায্য প্রয়োজন। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্পদশালী হয়।
এই আটটি খাতের বাইরে জাকাত প্রদান বৈধ নয়।
জাকাত না দিলে এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে কোরআনে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। আল্লাহ বলেন:
“যারা স্বর্ণ ও রূপা সঞ্চয় করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। সেদিন সেই সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তাদের কপাল, পার্শ্ব ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে।”
(সূরা তাওবা: ৩৪–৩৫)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি জাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন তার সম্পদ বিষাক্ত সাপে পরিণত হয়ে তাকে দংশন করবে।”
(সহিহ বুখারি)।
জাকাতের উত্তম খাতের মধ্যে অন্যতম হলো আল্লাহর পথে ব্যয় করা—দ্বীনের দাওয়াত, ইসলামী শিক্ষা ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমে সহায়তা করা। বিশেষভাবে এতিম ও মিসকিন শিশুদের জন্য পরিচালিত হিফজুল কোরআন মাদরাসা, যেখানে তারা কোরআন মুখস্থ করে এবং হাদিস শিক্ষা লাভ করে—এসব প্রতিষ্ঠানে জাকাত দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এতে একদিকে দরিদ্র শিশুরা আলোকিত হয়, অন্যদিকে দ্বীনের খেদমতও সম্পন্ন হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আমি ও এতিমের দায়িত্বগ্রহণকারী ব্যক্তি জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি থাকব” এ কথা বলে তিনি নিজের দুই আঙুল মিলিয়ে দেখান।
(সহিহ বুখারি)।
এই হাদিস এতিমদের সহায়তার গুরুত্বকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরে।
সুতরাং, জাকাত শুধু একটি ইবাদত নয়—এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং সমবণ্টনের শিক্ষা দেয়। যথাযথভাবে জাকাত আদায় করলে সম্পদ পবিত্র হয়, বরকত বৃদ্ধি পায়, দরিদ্রতা কমে এবং সমাজে শান্তি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাই প্রত্যেক সম্পদশালী মুসলমানদের উচিৎ, নিজের সম্পদের যথাযথ হিসাব করে প্রতি বছর জাকাত আদায় করে নিজের কর্তব্য আদায় করা এবং দরিদ্র ও ক্ষুধা মুক্ত সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসা।
লেখক: শিক্ষক, খতিব ও ইসলামী চিন্তক।