Donald Trump-এর নেতৃত্বে ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সামরিক উত্তেজনা এবং Strait of Hormuz-কে ঘিরে উদ্ভূত সংকট আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। এই সংকট শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক বিরোধ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, জোট রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গভীর সংকেত বহন করে।
বিশ্ব অর্থনীতির শিরা-উপশিরা হরমুজ প্রণালী:
হরমুজ প্রণালী পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই প্রণালীতে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা অবরোধ সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা এসবই এই সংকটের প্রত্যক্ষ ফলাফল।
ইরানের সম্ভাব্য অবরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, এটি শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে সংঘাত নয়—এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে।
একতরফা পদক্ষেপ ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব:
এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেকটাই দ্ব্যর্থপূর্ণ। একদিকে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ, অন্যদিকে পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্য- “হয়তো আমাদের সেখানে থাকা উচিত নয়”-এই দ্বৈত অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
একটি যুদ্ধ শুরু করার পর আন্তর্জাতিক সমর্থন চাওয়া এবং সেই সমর্থন না পেলে মিত্রদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ এটি কূটনৈতিকভাবে দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্ররাও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
মিত্রদের অনীহা-জোট রাজনীতির পরিবর্তন:
যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। Keir Starmer জানিয়েছেন, তার দেশ ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়াবে না। একইভাবে Emmanuel Macron ঘোষণা দিয়েছেন, “ফ্রান্স এই যুদ্ধ বেছে নেয়নি।”
জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী Boris Pistorius সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন-যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী সামরিক শক্তি যেখানে রয়েছে, সেখানে কয়েকটি ইউরোপীয় যুদ্ধজাহাজ কী পরিবর্তন আনতে পারে?
এই প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, বর্তমান বিশ্বে মিত্রতার ভিত্তি শুধুমাত্র ঐতিহাসিক সম্পর্ক নয়; বরং তা নির্ভর করছে কৌশলগত স্বার্থ এবং বাস্তবতার ওপর।
চীনের কৌশল-সংঘাত নয়, সংযম:
এই পরিস্থিতিতে China অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। তারা সরাসরি কোনো সামরিক জোটে যুক্ত না হয়ে সকল পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। এটি চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ, যেখানে তারা সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারে মনোযোগ দেয়।
চীনের এই অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বিকল্প নেতৃত্বের ইঙ্গিত দেয়, যা শক্তির পরিবর্তে স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়।
ন্যাটো ও নেতৃত্ব সংকট:
এই সংকটে NATO-এর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জোটের প্রতি অসন্তোষ এবং বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি এই সামরিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে চিন্তার জন্ম দিয়েছে। ন্যাটো দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু যদি এর প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এর প্রতি আস্থা হারায়, তাহলে এই জোটের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইউরোপের বার্তা-কূটনীতিই সমাধান:
ইউরোপীয় দেশগুলো এই সংকটে যে অবস্থান নিয়েছে, তা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—তারা আর অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে জড়াতে চায় না। বরং তারা কূটনৈতিক সমাধান এবং সংলাপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এমনকি নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ডও তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা এই সংঘাতে কোনোভাবেই জড়াতে চায় না। এটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান এবং নিরপেক্ষতার নীতির একটি শক্তিশালী উদাহরণ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব চ্যালেঞ্জ: এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এককভাবে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে কতদূর এগোনো সম্ভব। হরমুজ প্রণালীতে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানো অত্যন্ত জটিল, কারণ এটি ইরানের ভৌগোলিক প্রভাবাধীন এলাকা।
অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনীর সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত এবং পেন্টাগনের মূল্যায়নগত ভুল এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক যুদ্ধ শুধুমাত্র সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে কৌশল, তথ্য এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের ওপর।
বিশ্ব রাজনীতির নতুন বাস্তবতা: এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে-বিশ্ব এখন আর একক শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। বরং এটি একটি বহুমাত্রিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া-সবাই নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ফলে কোনো একক দেশ চাইলেই বিশ্বকে তার ইচ্ছামতো পরিচালনা করতে পারছে না।
সুতরাং আলোচনার পরিসরে বলা যায়, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বর্তমান সৃষ্ট সংকট আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, তার পরিণতি সামলানো ততটাই কঠিন। একতরফা সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং জোটের দুর্বলতা-এসবই একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দিতে পারে। আজকের বিশ্বে সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। অন্যথায়, শক্তিশালী রাষ্ট্রও একসময় নিজেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখতে পারে।
(অতিথি কলাম লেখক)