মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
দেশের ২১ জেলার প্রবেশদ্বারখ্যাত রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরি নৌরুট। এ রুটে পারাপারে যেন ভোগান্তির শেষ নেই। ফেরি ও লঞ্চ ঘাট গুলো মেরামতের নামে চলে বছরের পর বছর শুভংকরের ফাঁকি। দীর্ঘদিন ধরে ফেরি ও লঞ্চ ঘাট যাত্রী ও যানবাহন পারাপারের অযোগ্য হলেও কর্তৃপক্ষের নেই কোন তদারকি। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট-বড় দুঘর্টনা। বড় দুঘর্টনা ঘটলে কয়েকদিন আলোচনা চলার পর থেমে যায় সব কার্যক্রম। এরই মধ্যে ঘটে গেল মর্মান্তিক বাস দুঘর্টনা। এতে নিমিষেই ঝড়ে গেল ২৬টি তাজা প্রাণ। এবারও কি ফিরবে না কর্তৃপক্ষের হুশ।
সরেজমিন দৌলতদিয়া ফেরি ঘাট ঘুরে দেখা যায়, ৭টি ফেরি ঘাটের মধ্যে ১,২, ৫ ও ৬নম্বর ঘাট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। যানবাহন ও যাত্রী পারাপারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ৩, ৪ ও ৭নম্বর ফেরি ঘাট। ফেরি ঘাটে নদীর পানি কমে যাওয়ার কারণে এ্যাপোচ সড়ক বেশি ঢালু হয়ে পড়েছে। এ কারণে যানবাহন ফেরিতে উঠতে গিয়ে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে প্রায়ই ভারী যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠতে গিয়ে ঘটছে দুঘর্টনা।
লঞ্চ ঘাটের অবস্থা আরও খারাপ। দীর্ঘদিন আগে লঞ্চ ঘাটে যাওয়ার পাটাতন ভেঙ্গে পড়ে রয়েছে। নিচে বালুর বস্তা দিয়ে যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য কাঠের পাটাতন দেওয়া হয়েছে। সেটিও এখন চরম ঝুঁকিপুর্ণ। সেখানেও ঘটতে পারে দুঘর্টনা।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া দিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার যানবাহন পারাপার করা হয়। পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় দৌলতদিয়া ঘাটের সবগুলো সংযোগ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুন উচু হয়েছে। যে কারণে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা-ধুলোবালিতে একাকার থাকছে পুরো ঘাট এলাকা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ফেরি ঘাটের এ্যাপোচ সড়ক প্রায়ই মেরামত করা হয়। তবে সেটি স্থায়ী নয়, কিছু ইট, সুরকি ফেলে কোন মতো চলাচল করার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু প্রতিবছরই ঘাটের এ্যাপোচ সড়ক ও অন্যান্য সব মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। সেই অর্থ যায় কাদের পকেটে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
বাস চালক সজিব, আলমগীর, আমিনুল বলেন, ফেরি ঘাটের এ্যাপোচ সড়ক সরু ও ঢালু থাকার কারণে ফেরিতে উঠতে চরম বেগ পেতে হয়। আবার ফেরি আসার আগেই সড়কে গাড়ী এ্যাপোচ সড়কে নামিয়ে দেয়। ফলে ফেরী থেকে নামা যানবাহন ও উঠা যানবাহনের একটি প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। সাথে আছে ব্যাটারী চালিত অটো রিকসার দৌড়াত্ব। তারা ফেরির পল্টুনে উঠে যাত্রী পরিবহন করে। এতে চরম বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়।
তারা আরও বলেন, ফেরি ঘাটের পল্টুন ফাঁকা থাকার কারণে কোন রকম ব্রেক ফেইল করলেই চলে যেতে হয় পদ্মা নদীতে। কোন রকম বেড়িয়ার না থাকায় সামান্য একটু ভুল হলেই বিপদ। এরআগেই অনেকবার পল্টুন থেকে নদীতে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ট্রাক চালক আতিয়ার, ওলিয়ার বলেন, বর্তমানে পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় দৌলতদিয়ায় সচল থাকা ৩, ৪ ও ৭ নম্বর ঘাটের সংযোগ সড়কগুলো উচু ও পল্টুনগুলো নিচু হয়েছে। যে কারণে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা। ঘাট এলাকায় ধুলাবালিতে একাকার সব সময়। ঘাটগুলো এ্যাপ্রোচ সড়ক থেকে উচু হয়ে যাওয়ায় প্রতিটি ফেরি লোডিং ও আনলোডিং হতে সময় লাগছে বেশি। এ অবস্থার জন্য ঘাট কর্তৃপক্ষকেই দুষছেন চালকেরা। ঘাট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার জন্য ঘটছে দুর্ঘটনা। নষ্ট হচ্ছে গাড়ির যন্ত্রাংশ।
রাজবাড়ীর ট্রাকের চালক খায়ের উদ্দিন মিয়া বলেন, প্রতি বছর এ সময়ে ঘাটে এসে ভোগান্তিতে পরতে হয়। ভোগান্তি কমাতে এখনই ব্যবস্থা না নিলে আরও বড় ধরণের বিপদ হতে পারে। আর ঘাটে পদে পদে চলে চাঁদাবাজি। ট্রাক প্রতি ১শত থেকে ২শত টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়। প্রতিটি প্রাইভেটকার ও মাইক্রো থেকে ১০-২০ টাকা করে নেওয়া হয়। এতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদাবাজি হয়। এ চাঁদাবাজির সাথে সবাই জড়িত।
তিনি অরও বলেন, মূলত এ ঘাটে কর্মকর্তারা বেশির ভাগ ঘুমিয়ে সময় কাটান। আর দায়িত্ব পালন করে কর্মচারীরা। ফলে ভেঙে পড়েছে ঘাট ব্যবস্থাপনা।
ঢাকাগামী যাত্রী হৃদয় বলেন, একটি নিরাপদ যানজটমুক্ত ভোগান্তিমুক্ত ঘাট চান তারা। এখানে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করা হলেই কাটতে পারে এ নৌরুটের ভোগান্তি।
গত ২৫ মার্চ বিকেল সোয়া ৫টার সময় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া তিন নম্বর ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহন পদ্মায় ডুবে ২৬ জনের লাশ উদ্ধার আর সাধারণ মানুষের হাজারো প্রশ্নের পাহাড়। দেশ ডিজিটাল হলেও ফেরিঘাটের সব কিছুই এনালগ পদ্ধতির এমনকি পল্টন গুলোও পুরাতন আমলের। সৌহার্দ্য পরিবহন বাসটি দৌলতদিয়া তিন নম্বর ফেরিঘাটে আসে এটি একটি অস্থায়ী ঘাট। মুল ঘাট নস্ট হওয়ায় পাশ দিয়ে আরেকটি এপ্রোস সড়ক করে ঘাট তৈরি করা হয়েছে। এটা ছিল অত্যন্ত ঢালু এবং ছড়ানো ছিটানো। দোষ ঢাকতে পরের দিন বিআইডব্লিউটিএ তড়িঘড়ি করে মেরামত করে সেই রাস্তা। দৌলতদিয়ার প্রতিটি ঘাটের অবস্থা একই। একই দিন সকালে তরমুজ বোঝাই একটি ট্রাক অল্পের জন্য রক্ষা পায় সাত নম্বর ফেরিঘাটে। এ যেন প্রতিদিনের একটি সাধারণ চিত্র।
দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাট এলাকার স্থানীয় অধিকাংশ চালকরা বলেন, ফেরিতে ওঠানামার সড়কগুলো খাড়া ঢালু। লোড নিয়ে ফেরিতে গাড়ি ওঠানামা করতে অনেক সময় ব্রেক কন্ট্রোল (নিয়ন্ত্রণ) করতে সমস্যা হয়। ব্রেক ফেল করলেই দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে। ফেরিগুলোও পুরানো।
তারা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী, ঘাট পার হতে আসা যানবাহন পন্টুনে ওঠার আগের সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। এরপর ঘাটে আসা ফেরি থেকে সব যানবাহন নেমে যাওয়ার পর অপেক্ষায় থাকা যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠবে। বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে হাসনাহেনা নামের ফেরিটি ঘাটে এসে পৌঁছাতেই সংযোগ সড়ক থেকে চলতে শুরু করে বাসটি, যা সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে।
সৌহার্দ্য পরিবহনের দৌলতদিয়া ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মনির হোসেন বলেন, দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের জিরো পয়েন্টে অনেক সময় বিআইডব্লিউটিসির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা দায়িত্বে থাকেন। ঘাটের পরিস্থিতি না বুঝেই অনেক সময় নদী পাড়ি দিতে আসা ঢাকামুখী গাড়িগুলোকে ফেরিঘাটে পাঠিয়ে দেন।
মনির হোসেন বলেন, বুধবার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিকেও ৩ নম্বর ঘাটে পাঠিয়ে দেন। ঘাটে এসে তাঁরা দেখেন, একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে চলা শুরু করেছে। উপায় না পেয়ে পন্টুনের মাথায় সংযোগ সড়কে পরের ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন তাঁরা। কিছুক্ষণ পর আরেকটি ছোট ফেরি এসে পন্টুনে ধাক্কা দিয়ে ভেড়ে। সংযোগ সড়ক ঢালু সড়ক হওয়ায় এবং পন্টুনের ধাক্কা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চালক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। সরাসরি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায় বাসটি।
ঘটনার পরপরই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে আলাদা দু’টি তদন্ত কমিটি। তিন কার্যদিবসের মধ্যে দায় নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হলেও স্থানীয়দের অভিযোগের আঙুল ঘাটের নড়বড়ে অবকাঠামো আর পন্টুনের নিরাপত্তাহীনতার দিকে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) একে ‘ব্রেক ফেইল’ বলে দায় এড়াতে চাইলেও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—কেন বারবার এই ফেরিঘাটেই ঝরছে তাজা প্রাণ।
দৌলতদিয়া বিআইডব্লিউটিসির মহাব্যাবস্থাপক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পরে গিয়ে প্রাণ হানির ঘটনা ঘটে। বিআইডব্লিউটিসির লোকজন চেষ্টা করে বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে ফেরিতে তোলায় ১০-১২ জন যাত্রী প্রাণে বেঁচে যায়। সড়ক গুলো বিআইডব্লিউটিএর বলে তিনি জানান।
ফায়ার সার্ভিসের একজন ডুবুরি জানান, “ভেতরের দৃশ্য ছিল সহ্য করার মতো নয়। মা তার সন্তানকে বুকে চেপে ধরে ছিলেন, হয়তো শেষ মুহূর্তেও চেয়েছেন তাকে বাঁচাতে। কিন্তু পানির নিচে সেই কয়েক মিনিটের লড়াইয়ে প্রকৃতির কাছে তারা হেরে গেছেন।”
রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, এখনো নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। ডুবুরি দল, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে কাজ করছে। শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে আবারও উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে গাড়িটি দ্রুতগতিতে ছুটে নদীতে পড়ে যায়। তবে তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না।’
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মোঃ সলিম উল্লাহ দাবি করেন, বাসটির ব্রেক ফেল করায় চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ‘এখন থেকে বাসে যাত্রী নিয়ে সরাসরি ফেরিতে ওঠা নিষিদ্ধ করা হবে। চালক একা গাড়ি তুলবেন এবং যাত্রীরা হেঁটে ফেরিতে উঠবেন। পাশাপাশি পন্টুনে উঁচু রেলিং স্থাপন ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে ঘাট ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মোঃ রাজিব আহসান বলেন, নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়েও সরকার কাজ করবে। ঘটনার সুষ্টু তদন্ত পুর্বক দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।