ইমতিয়াজ উদ্দিন, জবি প্রতিনিধি:
পরিবারই হলো মানুষের প্রথম পাঠশালা, আর প্রধানত বাবা-মা-ই সেই পাঠশালার শিক্ষক। সমাজ যত এগোচ্ছে, ততই পরিবার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পুরনো দিনের উষ্ণতা ও সম্পর্কের আন্তরিকতা। আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতন অভিভাবক ও মজবুত পারিবারিক বন্ধন, কারণ একটি সুস্থ পরিবারই পারে একটি সুন্দর সমাজ গড়তে।
মানুষ কেবল রক্তের সম্পর্কেই পরিবার গড়ে তোলে না ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও বিশ্বাসের বন্ধন থাকলেই পরিবার পূর্ণতা পায়। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, ভাই-বোনের মধ্যে স্নেহ, দাদা-দাদির শিক্ষা সব মিলিয়ে পরিবার একটি শিশুর মানসিক ও নৈতিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। পরিবারে যে বন্ধন তৈরি হয়, তা মানুষকে সাহায্য করে নিজের কঠিন মুহূর্তে নিজেকে গড়ে তোলার, শক্তি সঞ্চয় করার এবং জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার।
দুর্ভাগ্যবশত, প্রযুক্তির এই যুগে বিলীন হয়ে যাচ্ছে একে অপরের প্রতি সম্মান, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ। ফলে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। একাকিত্ব ও হতাশা মানুষের মধ্যে প্রবেশ করছে, আর ছেলে-মেয়েরা ভুল পথে হাটছে। যেসব পরিবারে প্রতিদিন কিছুটা সময় কথা বলার, একসাথে খাবার খাওয়ার এবং আন্তরিকভাবে খোঁজ নেওয়ার প্রথা থাকে, সেখানে সন্তানদের ভুল পথে হাটার সম্ভাবনা অনেকটাই কম থাকে। কারণ এই সময়গুলো সন্তানদের মনকে সুরক্ষিত রাখে, তাদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে সহায়তা করে।
পরিবারে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ভালোবাসা একটি শিশুকে শেখায় কিভাবে অন্যকে মূল্যায়ন করতে হয়, কিভাবে ধৈর্য ধরতে হয় এবং কিভাবে নিজের অনুভূতিকে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে হয়। বাবা-মায়ের সাথে খোলামেলা সম্পর্ক শিশুদের জন্য আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। যখন পরিবারে ছোট ছোট আনন্দ ও কথোপকথনের মাধ্যমে সম্পর্ক গভীর হয় তখন তারা বুঝতে শেখে কিভাবে সমস্যা সমাধান করতে হয় এবং জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়।
বর্তমানে, আমাদের অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানদের মৌলিক চাহিদা খাবার, পোশাক ও শিক্ষা পূর্ণ করেই দায়িত্ববোধ সম্পন্ন করছেন। কিন্তু তারা সন্তানদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন নন। শিশুর অন্তর্দ্বন্দ্ব, ভয়, চাপ বা বিভ্রান্তি সম্পর্কে অনেক সময়ই তারা অবগত থাকেন না। অথচ একটি শিশুর বিকাশে মানসিক নিরাপত্তা, স্নেহ, দিকনির্দেশনা এবং সময় এই চারটি বিষয় খাবার–পোশাকের মতোই জরুরি।
সচেতন অভিভাবকের গুরুত্ব অপরিসীম। সন্তানের প্রথম শিক্ষা, চরিত্র গঠন এবং মূল্যবোধের ভিত্তি পরিবার থেকেই শুরু হয়। সচেতন অভিভাবক সন্তানের প্রতিটি পরিবর্তন লক্ষ্য করেন বন্ধুবর্গ, পড়াশোনা, আচরণ, অনলাইন কার্যকলাপ সবই নজরে রাখেন। এতে সন্তান ভুল পথে যাওয়ার ঝুঁকি কমে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুগে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অভিভাবকের অন্যতম দায়িত্ব।
অবহেলা, অতিরিক্ত কঠোরতা, বা কথা না শোনা এসব অভিভাবকের অসচেতনতার ফল হতে পারে। এতে সন্তান মানসিকভাবে একা হয়ে পড়ে। হতাশা, রাগ, খারাপ বন্ধুসঙ্গ, মাদকাসক্তি অথবা অনলাইন আসক্তি এসব ঝুঁকি বেড়ে যায়। পড়াশোনায় অনীহা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। সমাজে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু উদাহরণ হলো- কুমিল্লায় পাবজি গেমের কারণে কিশোরের আত্মহত্যা। কুমিল্লার এক ১২ বছরের কিশোর আত্মহত্যা করেছে, কারণ তাকে পাবজি খেলতে দেওয়া হয়নি। নোয়াখালীর সেনাবাগে এক কিশোর আত্মহত্যা করেছে এবং তার চিরকুটে লেখা ছিল, “ডিপ্রেশনই দায়ী।”
উপরোক্ত দুটি ঘটনার মূল কারণ অভিভাবকের অসচেতনতা। যদি বাবা-মা সন্তানকে সময় দিতেন, মনোযোগ দিতেন, তাহলে তারা মোবাইলে আসক্ত হতে পারত না এবং মানসিকভাবে নিঃসঙ্গ হত না। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানদের খাওয়ার সময় বা নিজেদের কাজে বিরক্ত না করার জন্য ফোন হাতে তুলে দেন, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
পারিবারিক বন্ধন শুধু সন্তান-অভিভাবক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভাই-বোন, দাদা-দাদি, নানা-নাতনি এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও সুসংহতভাবে বিদ্যমান থাকা উচিত। ঘরোয়া ছোট ছোট আড্ডা, একসাথে খাওয়াদাওয়া, আনন্দ-দুঃখ ভাগাভাগি, উৎসব পালন এসব ক্রিয়াকলাপ পারস্পরিক ভালোবাসা ও বোঝাপড়াকে দৃঢ় করে। যখন পরিবারে সব বয়সী সদস্যরা একে অপরের অনুভূতি ও প্রয়োজনে খেয়াল রাখে, তখন মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক বিকাশও প্রগতিশীল হয়।
পরিবারের বন্ধন শক্ত হলে, সন্তানরা সামাজিকভাবে সচেতন, সহমর্মী, দায়িত্বশীল এবং মানসিকভাবে স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তারা নিজের জীবনের সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। পারিবারিক বন্ধন, স্নেহ এবং অভিভাবকের সচেতনতা মিলিয়ে গড়ে উঠে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।
অতএব, সন্তানের সুস্থ, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল ভবিষ্যতের জন্য অভিভাবকের সচেতনতা অপরিহার্য। সন্তানকে শুধুমাত্র বড় করা নয় বরং তাকে বোঝা, ভালোবাসা, সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং মানসিকভাবে সুরক্ষিত রাখা প্রধান দায়িত্ব।
লিখেছেন তাসনিম জাহান খুশবু, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়