এম. আজগর সালেহী, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুরে চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত মো. নুরুল আবছার হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৪ জনকে নামীয় আসামি এবং আরও ৪০-৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেছেন নিহতের ছোট ভাই মো. হানিফ। মামলা দায়েরের পরপরই এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলায় এমন কয়েকজন ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে, যারা ঘটনার দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। এতে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন তারা।
নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, মামলায় কিছু আলেম-ওলামা ও সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদেরও জড়ানো হয়েছে, যা তারা ‘হয়রানিমূলক’ হিসেবে দেখছেন। নিরপরাধীদের দ্রুত মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
মামলার ৮ নম্বর আসামি নানুপুর মাদরাসার সাবেক শিক্ষক ও সৌদিআরব প্রবাসী মাওলানা আব্দুস সালাম অভিযোগ করে বলেন, জামায়াত কর্মী বাদী হানিফ ফেসবুকে হেফাজত আমীরের বিরুদ্ধে দেওয়া পোস্টের প্রতিবাদ করায় প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ঘটনার দিন এলাকায় না থেকেও তাকে আসামি করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ঘটনার দিন তিনি নারায়ণহাট ইউনিয়নের বিএনপি নেতা রাকিবুল হাসান চৌধুরী পিটুর বাড়িতে স্বপরিবারে দাওয়াতে ছিলেন।
আব্দুস সালাম আরও বলেন, বাদী নিজেই দাবি করছেন তার সামনে থেকে ৫০-৬০ জন ব্যক্তি তার ভাইকে তুলে নিয়ে গেছে, সেহেতু তিনি তাদের চিহ্নিত করতে পারার কথা। কিন্তু সে অনুযায়ী আসামি না করে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করায় এতে ভিন্ন স্বার্থের বিষয়টি স্পষ্ট বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ঘটনার আগের দিনের বৈঠকে উপস্থিত থাকা যদি অপরাধ হয়, তাহলে সেখানে উপস্থিত বহু মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার কথা, শুধু তাকে টার্গেট করা হয়েছে কেন—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি দাবি করেন, হেফাজত আমীরের পক্ষে কথা বলার কারণেই তাকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং এটি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।
স্থানীয়রা আরও জানান, এলাকায় চুরি বেড়ে যাওয়ায় ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যায় বারমাসিয়া গ্রামের ছয় সমাজের মানুষ, সমাজপতি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা চুরি রোধ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে একটি সালিশি বৈঠক করেন। পরদিন আরেকটি সামাজিক বৈঠক নিহত আবছার আর চুরি করবে না মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শালিশানদের নিকট আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আসলে একদল ক্ষুব্ধ লোক নুরুল আবছার ও রাসেলকে মারধর করে।
নিহত নুরুল আবছারের ভাই হানিফ অভিযোগ করেন, ভাইকে হত্যার আগে চুরির মালামাল খোঁজার অভিযোগে তার ভাই ও তার ঘরেও ভাঙচুর চালায় দুষ্কৃতকারীরা।
এলাকাবাসী দাবি করেন, নিহত নুরুল আবছারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চুরির অভিযোগ ছিল। এসব ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, যা থেকে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা তাদের। তবে তারা একই সঙ্গে বলেন, কোনো অভিযোগ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সম্পূর্ণরূপে অপরাধ এবং তা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি নিরপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, গত ৫ এপ্রিল বিকালে ফটিকছড়ি উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বারমাসিয়া গ্রামের খন্দকারপাড়া এলাকায় চুরির অভিযোগ তুলে নুরুল আবছারকে মারধর করা হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।