পৃথিবী যত আধুনিক হচ্ছে যুদ্ধের ধরনও তত বদলে যাচ্ছে। প্রাচীনযুগে যুদ্ধ হতো ঢাল-তলোয়ার ও পাথর-ধনুক দিয়ে। মধ্যযুগে এগুলোর পাশাপাশি বন্দুক ও কামানের গোলার ব্যবহার দেখা যেতো বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে। কামানের ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু করে চীন দেশ, মধ্যযুগে বিশেষ করে ১২শ শতক থেকে। কিন্তু ২য় বিশ্বযুদ্ধে প্রথমবারের মতো বিশ্বে পারমাণবিক বোমা ব্যবহৃত হয়। পৃথিবী এর আগে এমন ভয়াবহ অস্ত্র আর কখনো দেখেনি। হিরোশিমা ও নাগাসাকি পারমাণবিক হামলার শিকার হয় সেই সময়। সেই ইতিহাস সবার জানা। কিন্তু বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে ‘ডেটা-ওয়ার’ নামে নতুন এক যুদ্ধ শুরু হয়।
২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে পৃথিবী এক নতুন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আজকের যুদ্ধ কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, বরং এই যুদ্ধ ‘ডেটা’ বা তথ্য দখলের। বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যতের রণক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মারণাস্ত্র কোনো পারমাণবিক বোমা নয়, বরং হাতে স্মার্টফোনে থাকা কয়েক কিলোবাইট ডেটা।
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন যুদ্ধে মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, তথ্য বিকৃতি, তথ্য মুছে দেওয়া, তথ্য বিভ্রান্তির মতো বিভিন্ন কূটনৈতিক যুদ্ধ চালানো হয়। এতে ডেটা-ওয়ারের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক হারে পরিচিতি পায়। তবে ডেটা ওয়ারের ধারণা অনেক পুরনো। এর বিবর্তন হয়েছে আদিম গুপ্তচরবৃত্তি থেকে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত।
প্রাচীনকালে ডেটা মূলত সরাসরি শারীরিক সংকেতের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। তখনকার দিনে ধোয়ার সংকেত, আয়নার প্রতিফলন, কবুতরের মাধ্যমে তথ্য পাঠানো হতো। শত্রুরাষ্ট্র বিভিন্ন সীমানায় গুপ্তচর নিয়োগ করতো যারা এসব কবুতর ধরে ফেলতো বা কবুতরের সাথে লাগানো চিঠি পালটে দিয়ে তথ্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতো।
পরবর্তীতে তথ্যকে গোপন করতে কোড বা সংকেতের ব্যবহার শুরু হয়। সম্রাট জুলিয়াস সিজার সামরিক বার্তা গোপন রাখতে বর্ণমালা পরিবর্তন করে এক প্রকার নিজস্ব কোড ব্যবহার করতেন। এখান থেকে ধীরে ধীরে আধুনিক ডেটা এনক্রিপশনের উৎপত্তি হয়। তখনকার সময়ে শত্রুর হাতে থাকা চিঠি চুরি করে গোপন সংকেতের অর্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করা হতো।
পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ১৯ শতকে টেলিগ্রাফ ও রেডিওর আবিষ্কার ডেটা-ওয়ারের গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা জার্মানির একটি গোপন টেলিগ্রাম হ্যাক করে ফেলে, যা আমেরিকার যুদ্ধে যোগদানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তথ্য বিভ্রান্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ যুদ্ধের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি তাদের যুদ্ধবার্তা পাঠাতে বিশেষ মেশিন ব্যবহার করতো। এলান টিউরিং যখন এই মেশিনের কোড বা ডেট ক্র্যাক করেন তখন মিত্রবাহিনীর জয় অনেকটা নিশ্চিত হয়ে পড়ে।
১৯৯০ সালের পরে ইন্টারনেটের ক্রমাগত উন্নতির ফলে এই তথ্যযুদ্ধ কাগজ-কলম ছেড়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল সার্ভারে প্রবেশ করে। শুরু হয় ভাইরাসের মাধ্যমে তথ্য নষ্ট করার প্রবণতা। হ্যাকিং এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরির প্রবণতাও শুরু হয়। ইতিপূর্বে তথ্যযুদ্ধ আক্রমণকারীদের মাঝে সংগঠিত হতো। কিন্তু ইন্টারনেটের উন্নতি ও সাইবার স্পেস আবিষ্কারের ফলে এই তথ্যযুদ্ধ হ্যাকার ও সার্ভারের মাঝে সংগঠিত হয়। ২০১০ সালে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে Stuxnet ভাইরাসের হামলা ছিল প্রথম বড় ধরনের কোনো ডিজিটাল যুদ্ধ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক উত্থানের পর থেকে ডেটা-ওয়ার এখন ভিন্ন মাত্রায় পৌছে গিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারে শত্রুদেশ কখন, কোথায়, কিভাবে আক্রমণ করতে পারে। এমনকি যুদ্ধের পূর্বাভাসও দিতে পারে। যুদ্ধের সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যবহার হলো শত্রুপক্ষের নেতার কন্ঠ, চেহারা নকল করে এমনভাবে ভিডিও বা ছবি বানিয়ে সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া যেন সাধারণ মানুষ ও যুদ্ধরত সৈনিকেরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এরকম ঘটনা ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বহুবার ঘটেছে। বর্তমান সাম্প্রতিক ইরান-ইসরাইল যুদ্ধেও বারবার ঘটছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই ভাইরাস তৈরি করে প্রতিপক্ষের ফায়ারওয়ালে ছড়িয়ে দিতে পারে, এমনকি প্রতিপক্ষের ফায়ারওয়ালের দুর্বলতা খুজে বের করতে পারে। সাধারণ হ্যাকিং এর কাজ করতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেকেন্ডে কোটি কোটিবার সিকিউরিটি ডেটা আক্রমণ করতে পারে। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ করে ড্রোন হামলার সময় সোয়ার্ম ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ড্রোনের ডেটা প্রসেস করে এবং একে অপরের সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে।
আগে সেনাপ্রধান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতেন। কিন্তু এখন সেই জায়গায় বড় ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ড্রোন থেকে শুরু করে মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম পর্যন্ত সবকিছু এখন ডেটা দ্বারা পরিচালিত। যার কাছে যত বেশি নিখুঁত ডেটা এবং শক্তিশালী অ্যালগরিদম আছে, যুদ্ধের ময়দানে সে তত বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠছে। ২০২৬ পরবর্তী যুদ্ধের নতুন রূপ হবে স্বয়ংক্রিয় ডেটা পরিচালিত হাতিয়ার যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপের তেমন হয়তো প্রয়োজন হবে না। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো অটোমেশনের মাধ্যমে একেকটা যুদ্ধ পরিচালিত হবে।
বর্তমানে তেল বা গ্যাসের খনির মতো প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়েও ‘ডেটা সেন্টার’ অধিক মূল্যবান। চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা কিংবা ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ এই সবকিছুর পেছনেই রয়েছে তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। যেসকল দেশ তাদের নাগরিকদের তথ্য এবং রাষ্ট্রের গোপনীয় ডেটা সুরক্ষিত রাখতে পারবে না, ২০২৬ পরবর্তী বিশ্বে তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এখন দেশের সীমান্তগুলোতে কাঁটাতারের দেয়ালের চেয়েও জরুরি হয়ে পড়েছে শক্তিশালী দুর্ভেদ্য ‘ফায়ারওয়াল’।
লেখক: ইমতিয়াজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়