মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
পড়ালেখা শেষ করে একসময় নিয়মিত চাকরির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, জীবনে নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকেই তিনি বেছে নেন ভিন্ন পথ। চাকরির পিছনে না ছুটে ইচ্ছে ছিল উদ্যোক্তা হওয়ার। শুরুতে কয়েকবার ব্যর্থ হন তিনি। পরে শুরু করেন নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত আচার তৈরির কাজ। সেখান থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি উম্মে তছলিমা আকতারিকে। নিজের স্বপ্ন আর সাহসকে পুঁজি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি। তার সেই উদ্যোগই এখন রূপ নিয়েছে প্রিমি ফার্ম নামে একটি কারখানার। সেই কারখানায় তৈরি গরুর মাংসের আচার, বরই আচার, তেঁতুল আচার, জলপাই আচার, চালতা আচার, টমেটো আচার, রসুনসহ বিভিন্ন ধরনের আচার বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়।
উম্মে তছলিমা আকতারি নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের কামারপুকুর ইউনিয়নের বকসাপাড়া গ্রামের মো. শামসুজ্জামানের স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননী।
তিনি শুরুতে রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের কাজের উদ্যোগ নিয়ে সফল হতে পারেনি। পরে স্বামীর পরামর্শে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাড়িতে গরুর মাংসের আচার তৈরির কাজ শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করে বাড়তে থাকে বিক্রি। সেখান থেকে ক্রেতাদের চাহিদা লক্ষ্য করে তিনি গরুর মাংসের আচারের পাশাপাশি জলপাই আচার, চালতা আচার, রসুন আচারসহ কয়েক প্রকারের আচার তৈরি করতে বাড়িতে দেন প্রিমি ফার্ম নামে একটি কারখানা। এখন তার কারখানায় কাজ করে ২৫ জন শ্রমিক। তারা অনেকে ১০ হাজার আবার অনেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন পান।
এছাড়া তছলিমার তৈরি আচারের স্বাদ ও গুণগত মান বাড়িয়েছে ক্রেতার চাহিদা। বাড়িতে নিজস্ব স্লটার হাউজে গরুকে ভেটেরিনারি চিকিৎসক দ্বারা স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর জবাই করা হয়। পরে মাংস কেটে লাকড়ির চুলায় জ্বালিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় খাঁটি সরিষার তেলসহ প্রয়োজনীয় মশলা ব্যবহার করে তৈরি করা হয় গরুর মাংসের আচার। পরে সেটি প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হয়। অপরদিকে জলপাই আচার, চালতা আচার, রসুন আচার একই পদ্ধতিতে তৈরি হয় তার কারখানায়। আচারের গুনাগুন ও মান নিরাপদ হওয়ায় পেয়েছেন বিসিএসআইআর ল্যাব অনুমোদন।
উম্মে তছলিমা আকতারি বলেন, শুরুর পথ আমার কিছুটা কঠিন ছিল, তবে আমি আমার সিদ্ধান্তে অটুট ছিলাম। ছোট বেলা থেকে আমার ইচ্ছে ছিল নিজে কিছু করব আশপাশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব। আমি ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে গরুর মাংসের আচার তৈরির কাজ শুরু করি। পরে সেখানে সব ধরনের প্রসেস মেনে কাজ করি। নিজে বাজার থেকে গরু কিনে এনে ভেটেরিনারি চিকিৎসক দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে জবাই করে আচার তৈরি করে বিক্রি শুরু করি৷
কিছুদিন পরে ক্রেতার চাহিদা বাড়ে এতে আমার পরিসর বাড়তে থাকে। আমি পরে বাড়িতে প্রিমি ফার্ম নামে একটি কারখানা দেই। সেখানে গরু জবাই থেকে শুরু করে আচার তৈরির সব ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমার আচারের গুনাগুন ও মান সবকিছু পরীক্ষা করে আমাকে বিসিএসআইআর ল্যাব অনুমোদন দেয়। আমার কারখানায় নিরাপদ ভাবে আচার তৈরি করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হচ্ছে।
এছাড়া এখানে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করে, এখানে কাজ করে তাদের পরিবার আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে, অনেকে পরিবারের হাল ধরেছে। আমার ইচ্ছে শক্তি পরিবারের সহায়তা সবকিছু মিলিয়ে আজকে ভালোভাবে চলছি। এখন আচার দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করছি বাহিরের দেশেও বিক্রি করার স্বপ্ন দেখছি। আমার এখন প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ আয় হচ্ছে। আগামীতে বিদেশে পাঠানোর সুযোগ এবং পাঠানো গেলে বিক্রি আরও বাড়বে।
প্রিমি ফার্ম কারখানার শ্রমিক ফাতেমা বেগম বলেন, আমি গরীব মানুষ, স্বামীর রোজগারে কোনোভাবে সংসার চলছিল। আমরা এখানে এসে কারখানায় কাজ করি মাসে যে টাকা বেতন পাই সেটা দিয়ে আমাদের পরিবার ভালো চলে।
আরেক শ্রমিক মেহেদুল হাসান বলেন, হঠাৎ করে সড়ক দুর্ঘটনার পরে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে পারিনা। পরে তসলিমা আপুর কারখানায় কাজ শুরু করি, এখানে কাজ করে সংসার ভালো চলছে। আমাদের কারখানায় সবকিছুর মান ভালো, আমরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে সবকিছু করি।
সৈয়দপুর মহিলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক ও নারী সংগঠক শিউলি বেগম বলেন, তছলিমা একজন উদ্যমী নারী উদ্যোক্তা সে অনেকবার ব্যর্থ হলেও থেমে থাকেনি। নারীদের সামাজিকভাবে বিভিন্ন ধরনের বাঁধার মুখে পড়তে হয়, তবে আমি মনে করি নারীদের স্বাবলম্বী হওয়া জরুরি। তছলিমার কাজ সমাজের অনেক নারীর অনুপ্রেরণা হতে পারে।
এবিষয়ে সৈয়দপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নুর নাজার শাহাজাদী বলেন, নারীরা এগিয়ে যাবে এজন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের কাজ করি। বিষয়টি জানলাম তাকে কীভাবে সহায়তা করা যায় খোঁজ খবর নিয়ে সেটি করার চেষ্টা করব।