শেখ পরিবারের সদস্যদের কারও নামে কোনো প্রকল্প নিলেই সেটার প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই ‘অটোপাস’ করানো হতো। এছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও পরিকল্পনামন্ত্রীর সম্মতি ছাড়া কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই একনেক সভায় ওঠানো যায় না। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রীরা এ সুযোগ নিয়ে নিজ এলাকার জন্য বহু প্রকল্প পাস করিয়ে নিয়েছেন।
জানা যায়, শেখ পরিবারের নাম থাকলেই প্রকল্প সহজে পাস হতো একনেক সভায়। পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি থাকার পরও অনেক প্রকল্প প্রভাব খাটিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম প্রভাব খাটিয়ে ও শেখ হাসিনার নাম ব্যবহার করে নিজ এলাকায় ‘শেখ হাসিনা নকশিপল্লি, জামালপুর (প্রথম পর্যায়)’ নামে একটি প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নেন বলে জানা যায়। যদিও প্রকল্পের ৭৭২ কোটি টাকা বিফলে যাবে বলে মত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়-বিভাগগুলো প্রত্যেক প্রকল্পের প্রস্তাবনা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) আকারে পাঠায়। ডিপিপি যাচাই-বাছাই করার দায়িত্ব থাকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যদের। প্রত্যেক সদস্য সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্বরত। এসব সদস্য চাইলেই প্রকল্পের ডিপিপি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় সংশোধনের প্রস্তাব করতে পারেন অথবা পরিকল্পনামন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে এগুলো বাদ দিতে পারেন। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও পরিকল্পনামন্ত্রীর সম্মতি ছাড়া কোনো প্রকল্পই পরিকল্পনা কমিশনের একনেক সভায় ওঠানো যায় না। এ সুবিধা নিয়ে দায়িত্বকালীন একাধিক প্রকল্প অনুমোদন করিয়েছে নিয়েছেন সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও এম এ মান্নান।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সব সময় প্রকল্পের মেরিট দেখে যাচাই-বাছাই করা দরকার। কারণ জনগণের টাকায় জনগণের কল্যাণে প্রকল্প নেওয়া হয়। যে প্রকল্পে বেশি বেনিফট হবে সেই প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। এখানে অন্য কোনো ক্রাইটেরিয়া থাকা বা দেখার সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু আমরা দেখছি অর্থনৈতিক মেরিট না দেখে রাজনীতিবিদদের চেহারা দেখে প্রকল্প অনুমোদন হয়।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি উচ্চ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের এলাকাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে প্রকল্প নেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অথচ এটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটা এক ধরনের দুর্নীতি, এটা বন্ধ হওয়া জরুরি।’
সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রীর সুনামগঞ্জে প্রকল্পের হিড়িক
২০২৩-২৪ অর্থবছরে সুনামগঞ্জে ১০৮টি প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ছিল। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান নিজ এলাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নেন। নির্বাচনী এলাকায় রাস্তা-ঘাট-মসজিদ-মন্দির-মাদরাসার উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় হাসপাতালের আসন বৃদ্ধি, দুই উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন, দুই উপজেলা সড়কে দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, অধিকাংশ এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার, প্রত্যেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করেছেন। এমন অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে মন্ত্রীর এলাকায়। প্রকল্পের সংখ্যা বেশি হলেও এমএ মান্নানের অধিকাংশ প্রকল্প ছিল জনমুখী।
প্রকল্প নিলেই নিজ জেলার নাম দেখতেন মুস্তফা কামাল
কুমিল্লা-১০ আসনের সদর দক্ষিণ, লালমাই, নাঙ্গলকোট এলাকা নিয়ে সাবেক পরিকল্পনা ও অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামালের নির্বাচনী এলাকা। এ এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিল্পসহ সব ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন তিনি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েরও হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন। এছাড়া কুমিল্লা ইপিজেড ঘিরে অন্তত দুই লাখ মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে এবং গড়ে উঠছে পরিকল্পিত আধুনিক নগরায়ণ। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে। লালমাই ও সদর দক্ষিণ উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে আইটি পার্ক স্থাপনে জায়গা অধিগ্রহণের কাজ শেষ। এছাড়া নারীদের জন্য আরও একটি আইটি পার্ক স্থাপন হয়েছে। লালমাই ময়নামতি পাহাড়ি জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সাড়ে ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান। মূলত পরিকল্পনামন্ত্রী থাকার কারণে একাধিক প্রকল্প নিজ এলাকায় পাস করিয়ে নেন মুস্তফা কামাল। তিনি সব সময় নিজ প্রকল্পের মধ্যে নিজ জেলা আছে কি না সেটায় গুরুত্ব দিতেন।
দেশব্যাপী কতিপয় জেলায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেয় আইসিটি বিভাগ। প্রকল্পের ডিপিপিতে তখন কুমিল্লা জেলার নাম ছিল না। সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল শর্ত জুড়ে দেন কুমিল্লা জেলাকে প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলেই কেবল প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হবে। পরে প্রকল্পের ডিপিপি পুনরায় সংশোধন করে কুমিল্লা জেলার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর পরেই প্রকল্পের অনুমোদন দেন সাবেক এ মন্ত্রী।