নিজস্ব প্রতিবেদক:
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার চার্জশিটে ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক উত্তাল প্রেক্ষাপট, গণ-অভ্যুত্থান এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। এতে বলা হয়, ৪ আগস্ট রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ঘনিষ্ঠ চার উপদেষ্টা—ওবায়দুল কাদের, আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পরামর্শে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সেনা ও পুলিশ সমন্বয়ে আন্দোলন দমন পরিকল্পনার নির্দেশ দেন।
নথি অনুযায়ী, গণভবনে অনুষ্ঠিত এক গোপন বৈঠকে শেখ হাসিনা আন্দোলন দমনে গুলি চালানোর কথা বললে সামরিক কর্মকর্তারা তাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাকে গুলি করে মেরে ফেলো, গণভবনে কবর দিয়ে দাও।’ এরপরও তিনি বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী ও পুলিশের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
সেই বৈঠকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দিকী তার সমর্থন জানিয়ে বলেন, “গুলিতে কিছু লোক মারা গেলে বিক্ষোভ থেমে যাবে।” এমন মন্তব্যে উপস্থিত এক সামরিক কর্মকর্তা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং শেখ হাসিনাকে সতর্ক করেন তারেক সিদ্দিকীর ভূমিকা নিয়ে।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা তাকে পদত্যাগে অনুরোধ করলেও তিনি রাজি হননি। পরে সামরিক কর্মকর্তারা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলে তিনি মাকে পদত্যাগে সম্মত করান।
প্রসিকিউশনের নথি অনুযায়ী, শেখ হাসিনা বিদায়ী ভাষণ সম্প্রচারের অনুরোধ জানালেও সামরিক কর্মকর্তারা তা অনুমোদন করেননি। ৫ আগস্ট দুপুরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে ভারত পালিয়ে যান।
চার্জশিটে আরও উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনার নির্দেশে ঢাকা শহরের চানখাঁরপুল এলাকায় নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়, যাতে স্কুলছাত্র শাহরিয়ার খান আনাসসহ ছয়জন প্রাণ হারান। এতে অভিযুক্ত করা হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীকে, যিনি পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলির আদেশ দেন।
একইভাবে ১৪ জুলাই রাতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়, যাতে সহযোগিতা করে পুলিশ প্রশাসন। প্রসিকিউশন বলছে, এই সহিংসতাগুলো শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের মতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এমন একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো আদালতে উপস্থাপন করলেও তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব।