নিজস্ব প্রতিনিধি:
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ব্যাপক লুটপাটের দায় এখন বহন করছেন সাধারণ গ্রাহকরা। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক সহায়তা দিয়ে এসব দুর্বল ব্যাংককে সচল রাখার চেষ্টা করলেও বর্তমানে সে প্রক্রিয়াও থেমে গেছে। ফলে বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংক কার্যত কাগজে-কলমে টিকে থাকলেও গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে পারছে না।
এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত হতে রাজি না হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক ওই পাঁচ ব্যাংকের সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে। তালিকায় থাকা বাকি তিন ব্যাংক হলো ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। গ্রাহকেরা ব্যাংকে গিয়ে টাকা তুলতে না পেরে প্রতিনিয়ত হতাশ হয়ে ফিরছেন। কেউ কেউ চিকিৎসা, সন্তানের বেতন কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে অর্থ না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
ঢাকার হাটখোলা শাখার ইউনিয়ন ব্যাংকে গিয়ে দেখা গেছে, কর্মকর্তারা হতাশ হয়ে বসে আছেন। তারা জানিয়েছেন, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাউকে কোনো টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন গড়ে ২০-৩০ জন গ্রাহক খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। একই চিত্র গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকেও। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা বন্ধ হওয়ার পর শুরুতে কিছু অর্থ দেওয়া গেলেও এখন আর সম্ভব হচ্ছে না।
এ অবস্থায় গ্রাহকরা হতাশা ও ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। কেউ কেউ কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রতিকার চাইলেও কোনো সমাধান মিলছে না। অনেকেই ধারদেনা করে জরুরি প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে ব্যাংক খাত স্থিতিশীল করতে নানা পদক্ষেপ নেয়। দুর্বল ব্যাংকের ১৪টি পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়, প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দেওয়া হয়। তাতে ছোট অঙ্কের আমানতকারীরা কিছু অর্থ পেলেও বড় সঞ্চয়ের মালিকদের জন্য তা এখনো দুঃস্বপ্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণ ১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৭ শতাংশ। মূলধনে ঘাটতি রয়েছে ৪৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা ৯২ লাখের বেশি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ১৫ হাজারের বেশি।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ব্যাংক খাতের ৮০ শতাংশ অর্থ লোপাট হয়েছে। পুনর্গঠনে ৩৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আশ্বাস—“ব্যাংকে রাখা টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই”—গ্রাহকদের কাছে কেবল তামাশা হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।