১২ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৩শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

জলঢাকার কিশোর তীর্থের হাতে ড্রোন–মিসাইল প্রযুক্তিতে বিস্ময়

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

অদম্য মেধা, প্রযুক্তির প্রতি অটুট নেশা আর সীমাহীন কৌতূহল—এই তিন শক্তিতে ভর করেই ড্রোন, রকেট ও মিসাইল প্রযুক্তিতে এক অনন্য অধ্যায়ের সূচনা করেছে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার ব্র্যাক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী দেব স্বারতী তীর্থ।

করোনাকালীন ঘরবন্দী সময়কে কাজে লাগিয়ে প্রোগ্রামিং শেখার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ তাকে পৌঁছে দিয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দোরগোড়ায়। তবে অর্থসংকট বারবার থামিয়ে দিচ্ছে এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীর গবেষণা ও বিদেশের মাটিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন।

তীর্থ উদ্ভাবিত ‘মাল্টি-ফাংশনাল ড্রোন’ কেবল একটি সাধারণ প্রযুক্তিপণ্য নয়। এতে সংযুক্ত রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা, অবজেক্ট ট্র্যাকিং ও স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন—যা সামরিক বাহিনী ও উদ্ধার অভিযানের জন্য উপযোগী মিলিটারি-গ্রেড সক্ষমতা নিশ্চিত করে। ড্রোনটি উন্নত সেন্সরের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকা স্ক্যান করে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম—যা আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ড্রোন প্রযুক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে তীর্থ বর্তমানে কাজ করছে অত্যাধুনিক রকেট ও মিসাইল সিস্টেম নিয়ে। তার তৈরি মিসাইল নকশায় যুক্ত করা হয়েছে লো-রাডার সিগনেচার ডিজাইন ও এভেসিভ ম্যানুভারিং টেকনিক, যা শত্রুপক্ষের রাডার শনাক্তকরণ ও পাল্টা আক্রমণ এড়িয়ে চলতে সহায়ক। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে এমন উচ্চমাত্রার ধারণা ও প্রয়োগ একজন স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীর হাতে—এটাই তাকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়ানোর সুযোগ তীর্থের সামনে এবারই প্রথম নয়। এর আগে মালয়েশিয়ায় একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পেলেও বিমানভাড়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয় জোগাড় করতে না পারায় সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য রকেট ও মিসাইল গবেষণা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ হাতে থাকলেও, একই আর্থিক সংকটে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে তার যাত্রা।

তীর্থের বাবা তাপস কুমার দাস ও মা সঞ্চীতা সাহা আক্ষেপ করে বলেন, “সন্তানের মেধা আছে, স্বপ্ন আছে; কিন্তু দারিদ্র্য আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সহযোগিতা পেলে সে দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারত।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তীর্থ আরও এক ধাপ এগিয়ে—সাবমেরিন প্রযুক্তি ও পানির নিচে কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার রূপরেখা ইতোমধ্যে তৈরি করে রেখেছে সে।

জলঢাকা ব্র্যাক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিন্দ্র নাথ রায় বলেন, “তীর্থ আমাদের গর্ব। একজন কিশোরের হাতে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে—এটি বিরল। কিন্তু উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া এমন মেধাকে টিকিয়ে রাখা কঠিন।”

নীলফামারীর এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীর গবেষণা ও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এখন সময়োপযোগী উদ্যোগ জরুরি। সমাজের বিত্তবানদের সহায়তা এবং সরকারের সুদৃষ্টি পেলে তীর্থ কেবল নিজের নয়—সমগ্র দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top