মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
শীতকাল এলেই রবিশস্য ও বোরো আবাদকে ঘিরে দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিপ্রধান জেলা নীলফামারীতে শুরু হয় কৃষকের ব্যস্ততম সময়। আলু, গম, ভুট্টা, শাকসবজি ও বোরো ধানের ক্ষেতে সেচ, সার ও পরিচর্যায় দিন-রাত একাকার হয়ে যায় চাষিদের জীবন।
তবে মাঠের এই ব্যস্ততার আড়ালে নীরবে চলছে আরেকটি অদৃশ্য লড়াই—প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহের যুদ্ধ। চলতি মৌসুমেও সেই লড়াইয়ে পরাজিত হচ্ছেন কৃষকরা। সরকারি হিসাব বলছে, জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই; অথচ বাস্তবে কৃষকদের হাতে সময়মতো সার পৌঁছাচ্ছে না।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নীলফামারী জেলায় মোট ৪৯ হাজার ৮১৩ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আর চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ৪৭ হাজার ৫৬৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় বরাদ্দ সামান্য কমলেও তা কৃষি আবাদ পরিচালনার জন্য অপ্রতুল নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু এই সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বিস্তর ফারাক।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ডিলারদের গুদামে সার নেই—এমন অজুহাত দেখানো হলেও খুচরা বাজারে ঠিকই সার পাওয়া যাচ্ছে, তবে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দামে। জমিতে সার না দিলে ফসলের ক্ষতি অনিবার্য—এই বাস্তবতায় বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে তাদের। কৃষকদের প্রশ্ন, ‘যদি সত্যিই সারের সংকট থাকে, তাহলে খোলা বাজারে সার আসে কীভাবে? সংকটটা কি শুধু আমাদের জন্যই?’
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, নীলফামারী জেলার বড় একটি অংশের সার সরবরাহ কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে ডোমার উপজেলার গোমনাতি ও আমবাড়ি বাজারকেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ ব্যবসায়ী চক্র। এই চক্র পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে নন-ইউরিয়া সারের প্রতিটি বস্তায় অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত মুনাফা আদায় করছে।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে ডিলার ও পাইকাররা ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপিসহ প্রায় সব ধরনের সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। অভিযোগের তীর গিয়ে ঠেকছে গোমনাতি বাজারের মধু ট্রেডার্স, ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম ও নুর আলমসহ ডোমার বাজারের একাধিক ডিলারের দিকে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গোমনাতি ও আমবাড়ি বাজারসংলগ্ন একাধিক গুদামে বিপুল পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে। কিন্তু সেই সার নিয়মিতভাবে বাজারে ছাড়া হচ্ছে না। বরং ‘সংকট’-এর কথা বলে ধীরে ধীরে সার বাজারজাত করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
পরিবহন শ্রমিকরা জানান, তারা নিয়মিত ট্রাক্টর, পিকআপ ও অটোভ্যানে করে এসব গুদাম থেকে হাজার হাজার বস্তা নন-ইউরিয়া সার জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে সরবরাহ করেন।
ডিমলার খগারহাট বাজারের ব্যবসায়ী হাচানুর রহমান জানান, তিনি প্রতিদিন গোমনাতি বাজার থেকে গড়ে ২০০ বস্তা সার পাইকারি কিনে থাকেন। তার মতো ডোমার, ডিমলা ও জলঢাকার আরও বহু ব্যবসায়ী সেখানে থেকেই সার সংগ্রহ করে খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন। একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন ডোমার, জলঢাকা ও ডিমলার অন্তত ২০ জন সার ব্যবসায়ী।
ডিমলা, ডোমার ও জলঢাকা উপজেলার কৃষক জাহেদ আলী, আনোয়ার, কাশেম আলীসহ অন্তত অর্ধশত কৃষকের অভিযোগ, সরকারি ডিলাররা নামমাত্র সার বিতরণ করে বাকি অংশ সরাসরি ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। সেখান থেকেই কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের ভাষায়, ‘না কিনলে জমিতে সার দেওয়া যায় না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সার বিক্রেতা আরও গুরুতর অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, নীলফামারীর জন্য বরাদ্দ করা সারের একটি বড় অংশ অন্য জেলায় পাচার হয়ে যাচ্ছে। এমনকি বরাদ্দের অর্ধেক সার উত্তোলনের আগেই তা একাধিকবার হাতবদল হচ্ছে। এতে কাগজে কলমে মজুদ থাকলেও বাস্তবে বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মূল ডিলাররা কমিশনের ভিত্তিতে সাব-ডিলারদের মাধ্যমে সার বিক্রি করছেন, যা নীতিমালাবিরোধী। এছাড়া সরকারি বরাদ্দের সার বিদেশি ব্র্যান্ডের বস্তায় ভরে বেশি দামে বিক্রির ঘটনাও ঘটছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কয়েকজন ব্যবসায়ী এই প্রতিবেদককে সংবাদটি প্রচার না করার অনুরোধের পাশাপাশি ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কথোপকথনে মধু ট্রেডার্সের পরিচালক রাজু সারের অনিয়মের বিষয়টি আংশিকভাবে স্বীকার করে জানান, তিনি প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ বস্তা সার বিক্রি করেন, যা বিভিন্ন ডিলারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়।
তবে এখানেই শেষ নয়। নুর আলম দাবি করেন, মধু ট্রেডার্স ও রশিদুল ইসলাম প্রতিদিন প্রায় চার হাজার বস্তা সার বিক্রি করেন। বিপরীতে রশিদুল ইসলামের বক্তব্য, ‘নুর আলম একাই প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার বস্তা সার বাজারজাত করছেন।’ এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যই ইঙ্গিত দেয়—সার বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।
এদিকে জেলার ডিলারদের দাবি, সার বিতরণে কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। তাদের মতে, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন নীলফামারী জেলা ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার সাহা বলেন, ‘আমরা সরকারিভাবে যতটুকু বরাদ্দ পাই, ততটুকুই বিক্রি করছি।’
অন্যদিকে সার সংকটের বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান ও বিএডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানান, তিনি বিষয়টি অবগত নন। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
সরকারি মজুদের পরও যদি সময়মতো কৃষকের হাতে সার না পৌঁছায়, তবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়। এতে শুধু কৃষক নয়, সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রশ্ন তাই একটাই—নীলফামারীর এই সার সংকট কি প্রকৃত ঘাটতির ফল, নাকি একটি সুসংগঠিত চক্রের নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিমভাবে তৈরি সংকট, যার দায় এড়াতে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ?