১৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৩০শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

দখলদার ও ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানে স্বস্তি ফিরেছে ভাঙ্গুড়ায়, পালটেছে চিত্র

খালিদ হোসেন হৃদয়, ভাঙ্গুড়া(পাবনা) প্রতিনিধি:

ভাঙ্গুড়া উপজেলায় অবৈধ দখলদার ও ভেজাল পণ্য প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মিজানুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর নিয়মিত অভিযান, মোবাইল কোর্ট এবং ভূমি ও পৌরসেবায় সংস্কারের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

জানা গেছে, পাবনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভাঙ্গুড়া উপজেলা যা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে সমৃদ্ধ। খামারভিত্তিক এই অঞ্চলের দুধ, ঘি ও দুগ্ধজাত পণ্যের সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। চলনবিল সংলগ্ন হওয়ায় এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ জলমহাল ও বিল। তবে এই সুনামকে পুঁজি করে দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র নকল দুধ, ভেজাল ঘি, মধু, চিজ ও পনির তৈরি করে বাজারজাত করে আসছিল। একইসঙ্গে প্রভাবশালী মহল সরকারি খাস জমি, বিল ও জলমহাল দখল করে রাখে।

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ভাঙ্গুড়া উপজেলায় যোগদানের পর থেকেই এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেন এসিল্যান্ড মো. মিজানুর রহমান। গত তিন মাসে তিনি বিভিন্ন আইনে ১৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এসব অভিযানে মাদক, ভেজাল দুধ, মধু ও পনির উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ৭ জনকে দন্ড দেওয়া হয়। অভিযানে মোট ৮৩ হাজার ২০০ টাকা অর্থদন্ড আদায় করা হয়েছে।

মোবাইল কোর্টে জব্দ করা মালামালের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ১ হাজার ২০০ লিটার ভেজাল জেলি ও ২ হাজার ৫০ লিটার ভেজাল মধু ধ্বংস করা হয়। ব্যবহারযোগ্য কিছু পণ্য স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় বিতরণ করা হয়েছে।

আরোও জানা গেছে, অবৈধ দখল উচ্ছেদেও নেওয়া হয়েছে কার্যকর পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা সরকারি ভিপি ‘ক’ গেজেটভুক্ত সম্পত্তির লিজ কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়। এ পর্যন্ত লিজমানি হিসেবে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৩০০ টাকা। পাশাপাশি প্রায় ১০ একর ভিপি ‘ক’ গেজেটভুক্ত জমি উদ্ধার করা হয়েছে, যা লিজের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান। এছাড়া সরকারের দখল থেকে বেহাত হওয়া প্রায় ২ একর খাস জমি উদ্ধার করা হয়েছে।

ভূমি অফিসের সেবায় এসেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। প্রায় ২ হাজার নামজারি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। যেখানে আগে একটি নামজারি সম্পন্ন করতে গড়ে ৫৯ দিন সময় লাগত, বর্তমানে তা কমে এসেছে ১৯ দিনে। নামজারি বাবদ রাজস্ব তহবিলে জমা পড়েছে ১৫ লাখ টাকার বেশি। পাশাপাশি ভূমি উন্নয়ন কর থেকে আদায় হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টাকা। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ৪৭টি মিসকেস নিষ্পত্তি হওয়ায় ভোগান্তি কমেছে ভূমি মালিকদের।

এছাড়াও, অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর ভাঙ্গুড়া পৌরসভার উন্নয়ন কার্যক্রমেও গতি এসেছে। প্রথমবারের মতো ইমারত অনুমোদন কমিটি গঠন করে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুমোদনবিহীন শতাধিক ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা উন্নয়ন প্রকল্প পুনরায় চালু করা হয়েছে। পৌর কর আদায় ও ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে যারা পৌর কর ও ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করেননি, তাদের কাছ থেকেও কর আদায় শুরু হয়েছে।

পৌর নাগরিকদের জন্য চালু করা হয়েছে ডিজিটাল সেবা, উন্নত করা হয়েছে সড়কবাতি ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, মশক নিধন এবং যানজট ব্যবস্থাপনা।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, আগে ভূমি অফিসে কাজ করতে গেলে অনেক ঝামেলা হতো। এখন দ্রুত কাজ হচ্ছে, দখলদারদের দাপটও কমেছে।

ভাঙ্গুড়া পৌরসভার বাসিন্দা রওশন আরা বেগম বলেন, ভেজাল খাবার নিয়ে আমরা আতঙ্কে থাকতাম। এখন প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, এতে সাধারণ মানুষ উপকার পাচ্ছে।

প্রশাসনের ধারাবাহিক এসব উদ্যোগে ভাঙ্গুড়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিন অবহেলিত এই জনপদ ধীরে ধীরে শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের পথে ফিরছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমি চাই ভাঙ্গুড়া উপজেলা সবদিক থেকে এগিয়ে যাক। ভূমি সেবা নিতে এসে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে আমি কঠোর। অবৈধ দখল ও ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে। তবে সমাজের সব স্তরের মানুষের সহযোগিতা থাকলে এসব অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে হবে বলে জানান তিনি।

ছবি: পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মিজানুর রহমান।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top