২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

তিস্তা চুক্তির কাজ থমকে, ক্ষোভে ফুঁসছে নদীপাড়ের মানুষ

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

তিস্তা নদী—উত্তরাঞ্চলের প্রাণরেখা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা এই নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। অথচ বছরের পর বছর ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সীমাহীন দুর্ভোগ আর হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।

প্রতি বছর নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। সহায়-সম্বল হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। কৃষিকাজ, সেচ ও মৎস্য আহরণ—সবকিছুর জন্য তিস্তার ওপর নির্ভরশীল তীরবর্তী গ্রাম ও চরাঞ্চলের মানুষ আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীন ব্যবস্থাপনার কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা রূপ নেয় প্রায় মরা নদীতে। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও বিস্তীর্ণ বালুচর। পানিসংকট, নদীভাঙন ও জীবিকার সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরুর কথা ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু হবে—এমন আশায় বুক বেঁধেছিলেন নদীপাড়ের মানুষ। কিন্তু সম্প্রতি তিস্তা নদী পরিদর্শনে এসে জলবায়ু ও পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চলতি মাসে কাজ শুরু হচ্ছে না বলে জানালে সেই আশায় বড় ধরনের ভাটা পড়ে।

এই ঘোষণার পরপরই তিস্তা পাড়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে হতাশা আর ক্ষোভ। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে নদীভাঙন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এতে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, সেচ সংকটে পড়ছে ফসলের মাঠ এবং মৎস্য আহরণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন জেলেরা।

দীর্ঘদিনের পানিসংকট, নদীভাঙন ও কৃষি বিপর্যয়ে জর্জরিত উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ছিল শেষ আশার প্রতীক। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি না থাকায় সেই আশা এখন রূপ নিয়েছে গভীর হতাশা ও ক্ষোভে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ ৫৫ বছরেও তিস্তা নদীতে কোনো বড় ধরনের ড্রেজিং বা খননকাজ হয়নি। ফলে নদী ক্রমেই ভরাট হয়ে হারিয়েছে তার স্বাভাবিক গতিপথ। বর্তমানে তিস্তা অসংখ্য শাখা নদীতে বিভক্ত। বছরে মাত্র ছয় মাস মূল নদীতে নৌকা চলাচল সম্ভব হলেও বাকি সময় চরাঞ্চলের মানুষকে পায়ে হেঁটে নদী পার হতে হয়—যা যেন উন্নয়ন বঞ্চনার নীরব প্রতীক।

নদীর বাম তীর রক্ষা কমিটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমি। নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলায় প্রতিবছরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে মানুষ।

নদীপাড়ের মানুষ বিশ্বাস করেন, দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তিস্তা ফিরে পাবে তার হারানো যৌবন। বাড়বে কৃষি উৎপাদন, নিশ্চিত হবে মানুষের জীবিকা, গতি পাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রক্ষা পাবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

তবে এখন তিস্তা পাড়ের মানুষের একটাই দাবি—আর কোনো আশ্বাস নয়, আর কোনো রাজনীতি নয়। তারা দ্রুত দৃশ্যমান কাজ দেখতে চান। তিস্তার বুক জুড়ে যেন অবশেষে ফিরে আসে স্বস্তি, আর দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top