শরিফুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃ
সরকার যেখানে প্রাথমিক শিক্ষাকে দেশের মেরুদণ্ড বলছে, সেখানে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ৩নং মির্জানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন অভিভাবকদের ভাষায় ‘শিক্ষালয় নয়, যেন স্বেচ্ছাচারীতার আখড়া’। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ মাসুদ মিয়ার বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতন, সরকারি অর্থ লুটপাট, দায়িত্বহীনতা, ইচ্ছেমতো অফিসে আসা -যাওয়া ও প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করার কারনে ভেঙ্গে পড়েছে স্কুলের শৃঙ্খলা। এসব কারনে ফুঁসছে এলাকাবাসী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজেই নিয়ম ভাঙার কারিগর। ২৫ জানুয়ারী রবিবার সকাল সাড়ে ৯টায় স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি টিফিনে বাড়ি গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটান, কখনো ইচ্ছেমতো আসেন। প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় অন্য শিক্ষকরাও ক্লাস ছেড়ে অফিসের পাশের কক্ষে বেঞ্চ একত্রিত করে বিশ্রামে থাকেন। ফলে পুরো বিদ্যালয় কার্যত পাঠদানহীন হয়ে পড়েছে। প্রধান শিক্ষকের অবহেলার কারণে একই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রেহেনা রবিবার ১২ টা পর্যন্ত বিদ্যালয় অনুপস্থিত দেখা যায়। নাম প্রকাশে অভিভাবকরা জানান, প্রায় প্রতিদিন উক্ত সহকারী শিক্ষিকা প্রধান শিক্ষকের ছত্রছায়ায় ইচ্ছেমতে বিদ্যালয় সময়ের প্রতি তোয়াক্কা না করে বিদ্যালয় অনুপস্থিত থাকেন।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের নামে ডাস্টার দিয়ে মারধর, কান ধরে টানা যেন তার নিত্যদিনের চর্চা। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোঃ মাহির হোসেনকে মারধরের পর সে স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে বলে পরিবার জানায়। শিক্ষা দেওয়ার বদলে শিশুদের মনে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এটাই কি সরকারি বিদ্যালয়ের দায়িত্ব?
প্রাক-প্রাথমিকের অবস্থা আরও করুণ। গত ২৯-১০-২৫ইং তারিখে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা ৭ দিনের মধ্যে ফ্লোর ম্যাট কেনার নির্দেশ দিলেও তিন মাস পার হয়ে গেলেও একটি ম্যাটও কেনা হয়নি। বর্তমানে ২৯ জন শিশু শীতের মধ্যে নোংরা মেঝেতে বসে ক্লাস করছে। ছেঁড়া মাদুর, দুর্গন্ধযুক্ত টয়লেট, নোংরা পানির জার সব মিলিয়ে বিদ্যালয়টি যেন স্বাস্থ্যঝুঁকির আখড়া। শিক্ষার্থীদের টয়লেট ও ব্যাসিং ঝুল ময়লায় অব্যবহার যোগ্য পরিনত হয়েছে। এছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিদ্যালয় সংস্কার বাবদ প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ১ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেও সংস্কারের কোন তাড়া নেই প্রধান শিক্ষকের। এপ্রতিবেদকে অভিভাবকরা জানা, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মোঃ মাসুদ মিয়া বিদ্যালয়ের সরকারি বরাদ্দ, প্রাক-প্রাথমিক অনুদান ও নির্বাচন কেন্দ্র হিসেবে পাওয়া প্রায় দেড় লক্ষ টাকা কার্যত গায়েব করেছেন। উন্নয়নের কোনো চিহ্ন নেই। এছাড়া বিভিন্ন দিবসের বরাদ্দ থাকলেও নিজের পকেটস্ত করে জাতীয় প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে করে না প্রধান শিক্ষক।
প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার্থীদের জন্য আসা টাকা গেল কার পকেটে? অভিভাবক নিলুফা ইয়াসমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আগে স্কুলে ভিড় ছিল, এখন মানুষ সন্তান পাঠাতে ভয় পায়।”
রেহানা পারভীন বলেন, “সরকারি স্কুলে পড়েও আমার সন্তানকে তিনটা প্রাইভেট পড়াতে হয়। এটা লজ্জার।” অভিভাবকদের দাবি, এর আগে শতাধিক অভিযোগ জমা দিলেও রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা হয়নি। এতে শিক্ষা অফিস ও প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। জনগণের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন তাহলে কি একজন প্রধান শিক্ষক আইনের ঊর্ধ্বে?
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে মোঃ মাসুদ মিয়া প্রথমে রাজি থাকলেও পরবর্তীতে উক্ত বিদ্যালয় এর নৈশ প্রহরী গোলাম হোসেনের পরামর্শ তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে ‘বোঝাপড়া’ করার কথা বলেন। তার এমন মন্তব্য আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে। এলাকাবাসীর হুঁশিয়ারি অবিলম্বে তদন্ত না হলে তারা আন্দোলনে নামবে। শিশুদের শিক্ষা নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তারা।