২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১০ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্নীতির জাল জনস্বাস্থ্য ধ্বংসের নীরব কারখানা!

রবিউল ইসলাম বাবুল, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ

সরকার যেখানে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে, সেখানে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অদৃশ্য সাম্রাজ্য। অভিযোগ উঠেছে—এ প্রতিষ্ঠানটি এখন আর সাধারণ মানুষের সেবাকেন্দ্র নয়, বরং কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত লাভের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

চিকিৎসা নয়, এখানে বিক্রি হয় হয়রানি। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ—নামমাত্র সেবা দিয়ে দিনের পর দিন ঘুরানো হয়। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড, আউটডোর—সবখানেই অব্যবস্থাপনা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেসব ওষুধ বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, সেগুলো অধিকাংশ সময় ‘নেই’ বলে জানানো হয়। অথচ একই ওষুধ হাসপাতালের বাইরে নির্দিষ্ট ফার্মেসিতে সহজেই পাওয়া যায়—অতিরিক্ত দামে।

নামপ্রকাশ্যে এক ব্যক্তি বলেন,ডাক্তার আছেন কাগজে, নেই কর্মস্থলে। সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়ে। কাগজে-কলমে পূর্ণ জনবল থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত ভাবে অনেকন চিকিৎসক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই হাসপাতাল ছেড়ে দেওয়া, আউটডোর বন্ধ রেখে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখা—এ যেন নিত্যদিনের চিত্র। এতে করে চিকিৎসাসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে।

সরকারি সম্পদের অপচয় ও নথি অনিয়ম
অভিযোগ রয়েছে—হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ, যন্ত্রপাতি ব্যবহার, হাজিরা রেজিস্টার ও বিভিন্ন নথিপত্রে মারাত্মক গরমিল। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হয়। এতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি অর্থ কোথায় যাচ্ছে?

হাতিবান্ধা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্নীতির অভিযোগ এতটাই গুরুতর যে বিষয়টি নজরে আসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এর । একাধিকবার দুদক অভিযান চালিয়ে রোগী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পায় বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ অভিযান শেষে আবার সবকিছু আগের মতোই চলছে।

প্রশাসনের নীরবতা নিযে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে একাধিক
এতসব অভিযোগ ও তদন্তের পরও কেন দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই—এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে।

এদিকে জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানান হাতিবান্ধা উপজেলার সূশীল সমাজের একাধিক গন্যমান্য ব্যক্তি।

হাতীবান্ধা উপজেলার হাজারো দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের শেষ ভরসা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে তারা বাধ্য হচ্ছেন বেসরকারি ক্লিনিক বা দূরের জেলা রংপোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে—যা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। ফলে চিকিৎসার অভাবে ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষের জীবন।

এতসব অনিয়ম অব্যবস্থাপনার দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না হলে বিপর্যয় অনিবার্য হবে বলে মন্তব্য স্বাস্থ্যসেবা নিতে সাধারণ মানুষের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কঠোর তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শুধু ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকিতে পরিণত হবে।

এখন দেখার বিষয়—স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কবে এই দুর্নীতির দেয়াল ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, নাকি নীরবতার আড়ালে আরও অনেক অভিযোগ চাপা পড়ে যাবে।

এ ব্যপারে হাতিবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পঃপঃ কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোন আলোচনা হলে তিনি ১ মাস ধরে হাসপাতালের তথ্য দিতে চেয়েও দেয়নি। তিনি আরও বলেন, লেখালেখি করে কি করার আছে করেন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। এই বলে তিনি ফোন কেটে দেন।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top