লেখক জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান:
কায়রোর রমজান এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা। সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে বিলীন হয়, তখন ইতিহাসের স্তব্ধ মিনারগুলো যেন নতুন আলোয় জেগে ওঠে। সেই আলো কেবল প্রদীপের নয়, আত্মারও। আর সেই আলোকমালার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকে প্রাচীন জ্ঞানের অনন্ত প্রহরী আল-আজহার মসজিদ। এখানে ইফতার মানে কেবল ক্ষুধা নিবারণ নয়, এটি হৃদয়ের সংযোগ, ভ্রাতৃত্বের স্পন্দন এবং বৈশ্বিক মুসলিম ঐক্যের এক জীবন্ত চিত্রপট।
বাইতুজ যাকাত ওয়া সদকা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে, শাইখুল আজহার ড. আহমেদ তৈয়বের তত্ত্বাবধানে প্রতিবছরের মতো এবারও আল-আজহারে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ইফতারের সুব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এই আয়োজন এক নীরব মহিমায় রূপ নেয় যেখানে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও আন্তরিকতা একসূত্রে গাঁথা।
আসরের নামাজ শেষ হতেই মসজিদের পূর্ব পাশের গেট দিয়ে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের প্রবেশ। সুশৃঙ্খল পদচারণায় তারা এগিয়ে যায় ভেতরের বিশাল প্রাঙ্গণের দিকে। প্রবেশমুহূর্তেই হৃদয়ে জন্ম নেয় এক অপার্থিব অনুভূতি সামনে ঐতিহাসিক মসজিদ, চারপাশে কাঠের নকশাদার পর্দা, মাঝখানে সাদা টাইলস করা প্রশস্ত উঠান। নারীদের জন্য পৃথক পরিসর সেখানে তারা ইফতার করেন, নামাজ আদায় করেন, ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন।
খোলা আকাশের নিচে সেই সাদা উঠানে বসে যখন সন্ধ্যার মৃদু বাতাস গাল ছুঁয়ে যায়, তখন মনে হয় এ যেন পৃথিবীর কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশান্ত দ্বীপ। কেউ কুরআন তেলাওয়াত করছেন, কেউ তাসবিহ পাঠে নিমগ্ন, কেউ নীরবে দোয়ার হাত তুলেছেন। ভাষা আলাদা, উচ্চারণ ভিন্ন, পোশাক-আশাকের বৈচিত্র্য স্পষ্ট তবু সবার হৃদস্পন্দন এক ছন্দে বাঁধা।
প্রায় ১২০টি দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে সমবেত হন। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, সুদানসহ আফ্রিকা ও এশিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আগত তরুণরা একসঙ্গে বসেন একই চৌহদ্দিতে। বাংলাদেশ থেকেও বহু শিক্ষার্থী এই মিলনমেলায় অংশ নেন। কিন্তু এখানে জাতীয়তার রেখাগুলো মুছে যায়, কেবল একটি পরিচয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমরা মুসলমান, আমরা এক উম্মাহ।
আসরের পরপরই খোলা উঠানে শুরু হয় ইফতার পরিবেশনের প্রস্তুতি। নিঃশব্দে, সুপরিকল্পিতভাবে ইফতারের সামগ্রী সাজিয়ে রাখা হয় সারি সারি। কোথাও হইচই নেই, নেই বিশৃঙ্খলার লেশমাত্র। প্রত্যেকে যেন নিজ নিজ দায়িত্বে অবিচল, ইবাদতের অংশ হিসেবেই কাজটি সম্পন্ন করছেন। এই দৃশ্য কেবল আয়োজনের নয়, এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার এক অনুপম শিক্ষা।
আজানের প্রায় পনেরো মিনিট আগে এক কারী সুমিষ্ট কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত শুরু করেন। তাঁর কণ্ঠধ্বনি সন্ধ্যার আকাশে ভেসে ওঠে, মিনারের গায়ে গিয়ে মৃদু প্রতিধ্বনি তোলে। সাদা উঠান, প্রাচীন স্থাপত্য, নিমগ্ন শ্রোতারা সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অতল সৌন্দর্য। তিলাওয়াত শেষ হতেই মাগরিবের আজান ধ্বনিত হয়। প্রত্যেকের সামনে রাখা ইফতারি থেকে খেজুর ও পানি আহারেই ইফতার সম্পন্ন করে সবাই দ্রুত নামাজে দাঁড়িয়ে যান। সরলতায় যে কত গভীর মর্যাদা লুকিয়ে থাকে, এই দৃশ্য তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
নামাজ শেষে বাকি খাবার জুস, পানি, ভাত, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, সস, রুটি ও কোপ্তা। বাংলাদেশের ইফতারের রঙিন আয়োজন ছোলা, মুড়ি, চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু যেমন আলাদা স্বাদ বহন করে, তেমনি আল-আজহারের ইফতারও বহন করে এক ভিন্ন আবহ। এখানে জাঁকজমক কম, কিন্তু তৃপ্তি গভীর। কারণ এ আহার কেবল শরীরের নয়, আত্মারও পুষ্টি জোগায়।
ইফতারের পর কেউ তারাবির প্রস্তুতি নেন, কেউ নীরবে বসে থাকেন প্রাঙ্গণে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে মৃদু স্বরে আলাপ করেন। কিন্তু পুরো পরিবেশজুড়ে থাকে এক অনুচ্চারিত শ্রদ্ধা ও প্রশান্তি। মনে হয়, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত এই তরুণরাই ভবিষ্যতের আলোর বাহক যারা কুরআনের জ্ঞান ও নৈতিকতার শিক্ষা নিয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরবেন।
আল-আজহারের সাদা উঠানে প্রতিদিনের এই ইফতার আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের নাম নয়, এটি সম্মিলিত মানবিকতারও শিক্ষা। পাঁচ হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে যখন খেজুর হাতে তুলে নেন, তখন তা কেবল একটি মুহূর্ত নয়, এটি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যুক্ত এক জীবন্ত ঐক্যচিত্র।
রমজানের এই সন্ধ্যায় আল-আজহারের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হয় বিশ্ব যত বিভক্তই হোক, ইমানের বন্ধন অটুট। এখানে আমরা শিখি বিনয়, শৃঙ্খলা ও সহমর্মিতা। আর হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত হয় এক নীরব স্বীকারোক্তি আমাদের পরিচয় একটাই, আমরা মুসলমান।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর