ইমতিয়াজ, জবি প্রতিনিধি:
জীবন যেন অনিশ্চয়তায় ভরা। অনিশ্চয়তার অনুভূতি আসে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা থেকে। ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা আসলে ভবিষ্যৎ খারাপ হবে এই কাল্পনিক বোঝা বয়ে বেড়ানো। ভবিষ্যত যে সর্বদা ভালো হবে তা বলছি না। কিন্তু ভবিষ্যৎ আসলে খারাপই হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কিন্তু অনিশ্চয়তার অনুভূতি আমাদের মনকে সেই গ্যারান্টি দেবার চেষ্টা করে বারবার।
অনিশ্চয়তা কতটুকু দূর করা যায় তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাত্ত্বিক ও দার্শনিকরা গবেষণা করেছেন। অনিশ্চয়তা দূর করার ব্যাপারে তারা কোনো উপসংহারে পৌছাতে পারেনি। কারণ অনিশ্চয়তা সরলরেখায় চলমান কোনো চিরন্তন সূত্র নয় যে, এটাকে কোনো ছাচে ফেলা যাবে। বরং অনিশ্চয়তার অনুভূতি আসলে ভবিষ্যতকে না জানার কুফল। অহ, হ্যা। কুফল শব্দটা শুনলে একটা নেতিবাচক অনুভূতি জন্মায়। সত্যি বলতে, কুফল এখানে একটি ব্যঙ্গাত্মক পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ভবিষ্যতকে জানা কারোর পক্ষে সম্ভব না। তাই অনিশ্চয়তার অনুভূতিও কখনো মানুষের মন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব হবে না। বরং অনিশ্চয়তার অনুভূতি আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। একে সাথে নিয়েই আমাদেরকে বাচতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে। অনিশ্চয়তার অনুভূতি থেকেই প্রাচীন সমাজ আজ এতদূর এসেছে। প্রাচীনকাল থেকে নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার অনুভূতি থেকেই সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্ম। খাবার না পাবার অনিশ্চয়তার অনুভূতি থেকেই আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার উৎপত্তি। খাদ্য নষ্ট হয়ে যাবার আশঙ্কা থেকেই সংরক্ষণ ব্যবস্থার উৎপত্তি। তাই অনিশ্চয়তার অনুভূতি সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায় একটি আশীর্বাদ বটে। অনিশ্চয়তার অনুভূতিকে ইতিবাচক অভাব বলা যেতে পারে। অনিশ্চয়তার মাঝেই ঐ সমস্যার সমাধানকে লুকিয়ে থাকে। অনিশ্চয়তার অনুভূতি তখনই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যখন তা মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে এবং সেটার মধ্যে থাকা সমাধানকে এড়িয়ে গিয়ে শুধু অলস চিন্তার মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা হবে।
তবে মনোবিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারে একমত যে, অনিশ্চয়তাকে দূর করা সম্ভব না হলেও অনিশ্চয়তার অনুভূতিকে কমানো সম্ভব। এজন্য অনিশ্চয়তার মাঝে একটু ডুব দিতে হবে। অনিশ্চয়তা তোমাকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার অভাব অনুভব করায়। অনিশ্চয়তা তোমাকে ভবিষ্যত সম্পর্কে বারবার কাল্পনিক নেতিবাচক গ্যারান্টি দেয়। অনিশ্চয়তা তোমাকে বারবার বর্তমান থেকে কাল্পনিক ভবিষ্যত জগতে নিয়ে যায়। ভবিষ্যতের ভিত্তি কিন্তু বর্তমানের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। ভবিষ্যতের উপর আমাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে বর্তমান তিলে তিলে ভবিষ্যতকে গড়ে তোলে আর বর্তমানের উপর আমাদের সবার কমবেশি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আছে। বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে আমরা ভবিষ্যৎকে সুন্দর করতে পারি। আর ভবিষ্যৎ সুন্দর হলে অনিশ্চয়তার অনুভূতি আপনাআপনি দূরীভূত হয়ে যাবে। তাহলে এখন থেকে ভবিষ্যতের উপর কাল্পনিক দুশ্চিন্তা না করে বরং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে বর্তমানের উপর বেশি নজর দিতে হবে। বর্তমানে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য শক্ত সিস্টেম বা ব্যবস্থা গড়ে তোলতে হবে যেন তা তোমার ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখে। এই সিস্টেম বা ব্যবস্থা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনিশ্চয়তার অনুভূতি দূরীকরণে কেমন বা কী হওয়া উচিৎ তা পুরোপুরি আপেক্ষিক। ব্যক্তিভেদে এটা ভিন্ন ভিন্ন হয়।
বিবিএ এর সাবজেক্টগুলোতে ‘লিভারেজ’ নামে একটি টার্ম ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ‘লিভারেজ’ হলো হাতে থাকা সম্পদকে এমনভাবে ব্যবহার করা যেন অল্প পরিশ্রমে বহুগুণে ফলাফল পাওয়া যায় এবং ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও যেন সেই ফলাফল চলতে থাকে। প্রাচীন গ্রীসের এক বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস। আর্কিমিডিসের এক বিখ্যাত উক্তি থেকে লিভারেজের একটি সংজ্ঞা পাওয়া যায়।
আর্কিমিডিসের ভাষায়, ” যদি আমাকে একটা লিভার আর একটুখানি দাঁড়ানোর জায়গা দাও তবে আমি পুরো পৃথিবীটাকে নাড়িয়ে দিবো।”
আর্কিমিডিস ছিলেন লিভারেজের মাস্টার। তিনি হাতে থাকা বিদ্যমান বস্তুকে ব্যবহার করতেন অল্প পরিশ্রমে অসাধ্য সাধন করার জন্য। যদি লিভারেজের সিস্টেম আমরা গড়ে তোলতে পারি তবে বর্তমান অনেক সহজসাধ্য হবে যা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তাকে দূর করবে, অনিশ্চয়তার অনুভূতি দূরীভূত হবে।
বিমা ব্যবস্থা এমনই একটি লিভারেজ সিস্টেম যা মূলত প্রাচীনকালের নৌ-পথ এর অনিশ্চয়তার অনুভূতি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। প্রাচীন ব্যাবিলনে বণিকরা যখন মরুভূমি বা নদীপথে ব্যবসা করতে যেত, তখন ডাকাত বা ঝড়ের ভয় (অনিশ্চয়তা) থাকতো। তারা তখন এক ধরনের চুক্তি করতো: যদি কারো মালপত্র নষ্ট হয়ে যায়, তবে বাকি বণিকরা মিলে সেই ক্ষতি পূরণ করে দেবে।
এটি ছিল প্রথম “যৌথ লিভারেজ”। একা ঝুঁকি নিলে অনিশ্চয়তা বাড়ে, কিন্তু ঝুঁকি ভাগ করে নিলে অনিশ্চয়তা কমে। আর্কিমিডিসের সেই গ্রীক যুগেও নৌ-বিমা ছিল। যদি কোনো জাহাজ সমুদ্রে ডুবে যেতো তবে ঋণদাতারা সেই ঋণ মাফ করে দিতো। এটি করা হতো যাতে ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় পড়ে ব্যবসা বন্ধ না করে দেয়।
আধুনিক বিমা ব্যবস্থার শুরু হয় লন্ডনের কফি হাউসগুলোতে। সেখানে জাহাজ মালিকরা তাদের সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা জমা রাখতো। একে বলা যেতে পারে একটি “নিরাপত্তার সিস্টেম”।
একসময় চীনের উত্তর সীমান্তের যাযাবর জাতিগুলো (যেমন: শিউন-নু, মঙ্গোল) প্রায়ই চীনে আক্রমণ চালিয়ে সম্পদ লুটতরাজ করতো। যেহেতু চীন একটি কৃষিভিত্তিক দেশ ছিল, তাই তাদের কাছে জমির নিরাপত্তা ছিল সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। সম্রাটরা বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল সৈন্য দিয়ে এই বিশাল এলাকা রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই তারা একটি স্থায়ী বাধা বা ‘সিস্টেম’ হিসেবে এই দেয়াল গড়ে তোলেন। এটি দস্যুদের ঘোড়সওয়ার বাহিনীর গতি কমিয়ে দিতো।
অনিশ্চয়তার অনুভূতি থেকেই ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় সাইবার সিকিউরিটির জন্ম হয়। সাইবার সিকিউরিটির জন্ম ও বিবর্তন মূলত প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর মানুষের অনিশ্চয়তা বোধের এক নিরন্তর লড়াই। এই ইতিহাসের সূচনা হয় ১৯৭১ সালে বব থমাসের তৈরি করা ‘ক্রিপার’ (Creeper) নামক বিশ্বের প্রথম পরীক্ষামূলক ভাইরাসের মাধ্যমে, যা কোনো ক্ষতি না করলেও এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রাখতো। এই অনিশ্চয়তা কাটাতে জন্ম নেয় প্রথম অ্যান্টিভাইরাস ‘রিপার’ (The Reaper), যার কাজ ছিল ক্রিপারকে খুঁজে বের করে মুছে ফেলা। আশির দশকে যখন ইন্টারনেট তথা আরপানেট (ARPANET) বিস্তৃত হতে শুরু করে, তখন ‘মোরিস ওয়ার্ম’-এর মতো ক্ষতিকারক প্রোগ্রামের আক্রমণে পুরো নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার ১০ শতাংশ অচল হয়ে পড়ে। এই বিপর্যয় থেকেই জন্ম নেয় প্রথম কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (CERT), যা সাইবার নিরাপত্তাকে একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থার রূপ দেয়। নব্বইয়ের দশকে ইন্টারনেটের বাণিজ্যিক প্রসারের সাথে সাথে তথ্য চুরির ভয় যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন জন্ম নেয় ‘এনক্রিপশন’ বা তথ্যকে দুর্বোধ্য কোডে রূপান্তরের গাণিতিক শিল্প। এভাবেই ইতিহাসের প্রতিটি ধাপে নতুন নতুন ডিজিটাল হুমকির অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নিয়েছে ফায়ারওয়াল, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন এবং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর নিরাপত্তা সিস্টেম। আজকের সাইবার সিকিউরিটি আসলে সেই আদিম মহাপ্রাচীরেরই ডিজিটাল সংস্করণ, যা আমাদের বর্তমানের তথ্যকে ভবিষ্যতের অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখার একটি শক্তিশালী ‘লিভারেজ’ হিসেবে কাজ করে।
আমরা যত বেশি লিভারেজ সিস্টেম গড়ে তোলবো তত বেশি তা বর্তমানকে সুন্দর করবে এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা দূর করবে। আমাদের জীবনে অনিশ্চয়তার অনুভূতি দূর করতে এখন থেকেই একটি শক্তিশালী সিস্টেম বা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে সময়, শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে, কোনো নির্ভরযোগ্য লিভারেজ সিস্টেম একদিনে গড়ে উঠে না। বরং তা বছরের পর বছর সাধনার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে।
চীনের মহাপ্রাচীর একদিনে গড়ে উঠেনি। বরং এটি প্রায় ২৩০০ বছরের এক দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফসল।
আর্থিক অনিশ্চয়তার অনুভূতি দূর করতে প্যাসিভ ইনকাম গড়ে তোলা হবে বর্তমান সময়ের শক্তিশালী লিভারেজ সিস্টেম। প্যাসিভ ইনকাম হলো কোনো সিস্টেমের ভিতর দিয়ে এমনভাবে আয় করা যেখানে আয় করার জন্য শ্রম দিতে হয় না। এমন অবস্থায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও আয় করা সম্ভব। ইউটিউবিং করা, কন্টেন্ট ক্রিয়েট করা, ইবুক বানিয়ে বিক্রি করা, বই লিখে বিক্রি করা ইত্যাদি হলো প্যাসিভ ইনকামের একেকটি উদাহরণ যেখানে একবার শ্রম দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করলে ঐ কাজ থেকে বছরের পর বছর আয় আসে।
ছাত্রবয়সে পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্টের অনিশ্চয়তা দূর করতে দিনের পড়া দিনের শেষ করার সময়ানুবর্তিতাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে এবং এটাকে একটা সিস্টেমে দাঁড় করাতে হবে। যখন এই অভ্যাস সিস্টেমে দাঁড়িয়ে যাবে তখন পরীক্ষার আগেই সব পড়া শেষ হয়ে যাবে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে পরীক্ষা দেওয়া যাবে।