৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৮ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

লালমনিরহাট রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগে ব্যাপক অনিয়ম লাইসেন্স বাণিজ্যে সহ- কোটি টাকার লেনদেন

রবিউল ইসলাম বাবুল, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ

লালমনিরহাট রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি (এস্টেট) বিভাগে লাইসেন্স প্রদানের নামে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

এ অভিযোগের তীর উঠেছে বিভাগটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনজুর হোসেনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে লাইসেন্স নবায়ন ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা তৈরি করা হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক ধরনের অনিয়মের চক্র।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রেলওয়ের জায়গার ওপর দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বহু দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের আওতায় পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের ক্ষেত্রে নিয়মের পরিবর্তে প্রভাব ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেনকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন স্থানে রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করতে গেলে সংশ্লিষ্ট অফিসে নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, লাইসেন্সের কাগজপত্র পেতে গেলে ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে শুরু করে প্রায় ৮৪ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ দিতে হয়েছে। তবে এসব অর্থের কোনো সরকারি রসিদ দেওয়া হয়নি বলেও দাবি তাদের।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে নগদ অর্থ গ্রহণ করা হলেও পরে অফিসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে আংশিক অর্থ জমা দিতে বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৫৩ হাজার বা ৩৬ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা নেওয়া হলেও বাকি টাকার কোনো হিসাব বা রসিদের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

এদিকে লাইসেন্স সংক্রান্ত নথিপত্র দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তা দেখাতে অনীহা প্রকাশ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, লালমনিরহাট রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের অধীন বিভিন্ন জেলায় মোট ৮৪টি স্টেশন এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় রেলওয়ের জমিতে শত শত দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। নিয়ম অনুযায়ী এসব স্থাপনার লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন এবং উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা–২০২০ অনুযায়ী, রেলের জমিতে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, লাইসেন্সের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব আদায় যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, বাস্তবে এ নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে, লাইসেন্সবিহীন দোকানগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় অফিসে ডেকে চাপ প্রয়োগ করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে উচ্ছেদ অভিযান কিংবা মামলার ভয় দেখানো হয় বলেও জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. মনজুর হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “যে কোনো অভিযোগ থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।”

অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অভিযোগের বিষয়ে লিখিত তথ্য পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হলে রেলওয়ের রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরবে এবং অনিয়মের অভিযোগেরও সুষ্ঠু সমাধান হবে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top