১৫ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৬শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

নীলফামারীর ঐতিহ্যের সাক্ষী নীলকুঠি অবহেলায় ধ্বংসের পথে, সংরক্ষণের দাবি

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের নিদর্শন নীলফামারীর প্রাচীন নীলকুঠি আজ অবহেলা ও অযত্নে ধ্বংসের পথে। যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে এটি জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা।

জেলা শহর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে নটখানা এলাকায় অবস্থিত এই নীলকুঠি নির্মিত হয়েছিল ১৮০০ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ নীলকরদের উদ্যোগে। সে সময় নীল চাষ ও নীল প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্র হিসেবে এখানে একাধিক কুঠি ও খামার গড়ে তোলা হয়।

ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় প্রবীণদের মতে, তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ নীলকররা কৃষকদের ওপর জোরপূর্বক নীল চাষ চাপিয়ে দিত এবং অবাধ্য কৃষকদের ওপর নির্যাতন চালাত। সেই শোষণ ও অত্যাচারের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে এই নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুইশ বছর আগে এই এলাকায় বিস্তৃত নীল খামার ছিল। অনেকের ধারণা, ‘নীল’ চাষ ও ‘খামারী’ শব্দের সমন্বয় থেকেই সময়ের পরিক্রমায় ‘নীলফামারী’ নামের উৎপত্তি হয়েছে।

১৮৫৯-৬০ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহের পর ব্রিটিশদের নীল উৎপাদন কার্যক্রম ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেলে এসব কুঠি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। কালের বিবর্তনে অধিকাংশ নীলকুঠি বিলীন হয়ে গেলেও কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো ইতিহাসের স্মারক হিসেবে টিকে আছে, যার মধ্যে নটখানার এই নীলকুঠিটি অন্যতম।

তবে দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নেই কোনো সীমানা প্রাচীর কিংবা সংরক্ষণের ব্যবস্থা। ফলে এখানে প্রায়ই নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের আনাগোনা দেখা যায় এবং গবাদিপশুও অবাধে বিচরণ করে।

স্থানীয় বাসিন্দা আশাদুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এই ঐতিহাসিক নীলকুঠি দেখতে আসেন। কিন্তু অবহেলার কারণে এটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সংস্কার করা হলে এটি নীলফামারীর অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।”

নীলকুঠি দেখতে আসা দর্শনার্থী মনোজিৎ রায় বলেন, “এটি শুধু ইটের ধ্বংসাবশেষ হয়ে পড়ে আছে। কোনো রক্ষণাবেক্ষণ নেই। অথচ যথাযথ উদ্যোগ নিলে এটি ইতিহাস ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারত।”

এটিকে সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নীলফামারী মডেল কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা বলেন, “নীলকুঠি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এটি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিটিশ আমলে বাংলার কৃষকদের ওপর যে শোষণ ও নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার নীরব সাক্ষী এই স্থাপনাটি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থেকে এটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠবে। পাশাপাশি নীলফামারী জেলার একটি সম্ভাবনাময় ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান হিসেবেও পরিচিতি পাবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে জেলা প্রশাসনের কাছে আমাদের জোর দাবি—এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।”

এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, “নীলকুঠিটি নটখালায় অবস্থিত। বিষয়টি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, ব্রিটিশ আমলে বাংলার কৃষকদের শোষণের নির্মম ইতিহাস বহনকারী এই নীলকুঠিকে সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রক্ষা করা জরুরি। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবেই নয়, বরং নীলফামারীর গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top