১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৪শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

৫ দেশে নাসা গ্রুপ ও বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুলের হাজার কোটি টাকা পাচার

নাসা গ্রুপ ও বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। তবে এসব ছাপিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসাবে তার পরিচিতি সর্বত্র। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ানো তার হাস্যোজ্জ্বল ছবি। এ সুবাদে তিনি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির চেয়ারম্যান পদ পেয়ে যান। টানা প্রায় ১৫ বছর এই পদে। এই পদে যাওয়ার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে তিনি দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম মাফিয়া বনে যান। আর্থিক খাতের নানা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির টাকায় দেশ-বিদেশে গড়ে তোলেন অঢেল সম্পদ। বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বের একাধিক দেশে রয়েছে তার বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ। তবে শেষ পর্যন্ত ‘চোরের দশ দিন গৃহস্থের একদিন’ প্রবাদের মতো তারও শেষ রক্ষা হয়নি। তিনিও ধরা পড়লেন। মঙ্গলবার মধ্যরাতে নজরুল ইসলাম মজুমদারকে গ্রেফতারের সংবাদ দেয় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

সূত্র জানায়, লন্ডন এবং হংকং ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে মজুমদারের বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। সেখানে রিয়েল এস্টেট খাতে একাধিক কোম্পানি খুলে তিনি ব্যবসা করছেন। এছাড়া ২০১৫ সালের দিকে তিনি সৌদি আরবের কৃষি খাতে বিনিয়োগ করেন। সৌদির একাধিক খেজুর বাগানে বিনিয়োগ রয়েছে তার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এবং কাতারের রাজধানী দোহায় তার সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। সিআইডি জানায়, ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে নাসা গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৪টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে শত শত কোটি টাকা দুবাই, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান করছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে মজুমদার ব্যাপক ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। অংশীদারি ব্যবসা হলেও ক্ষমতার দাপটে নাসা গ্রুপে তিনি একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেন। এক পর্যায়ে কোম্পানির ২০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডার ও স্পন্সর পরিচালক আলতাফ হোসেনকে বেআইনিভাবে বের করে দেওয়া হয়। পরে একাধিক সাজানো মামলার পর গোয়েন্দা সংস্থাসহ প্রশাসন লেলিয়ে দেওয়া হয় তার (আলতাফ হোসেন) বিরুদ্ধে। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও দমেননি আলতাফ। মালিকানা ফেরত পেতে তিনি আইনি লড়াই শুরু করেন। পাশাপাশি মজুমদারের অর্থ পাচারের অকাট্য প্রমাণসহ নানা অনিয়মের ফিরিস্তি তুলে ধরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দফতরে চিঠি দেন।

অভিযোগের সূত্র ধরে মজুমদারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) গোপনে এক বিশেষ অসুন্ধান চালায়। এতে বিশ্বের একাধিক দেশে তার বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে লন্ডনের এইচএসবিসি ব্যাংকে মজুমদারের স্বনামে খোলা একটি হিসাবে (নম্বর ৪১৪৭৮৫০৮) বিপুল অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এ সময় লন্ডনে তার একাধিক বাড়ি, হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের খোঁজ মেলে। এর মধ্যে লন্ডনের প্যালেস গার্ডেন টেরেস (ডব্লিউ ৮৪৫বি) এলাকার ৩৯ বাড়িতে মজুমদার নিজেই মাঝে মাঝে গিয়ে থাকেন।

সূত্র জানায়, বিএফআইইউ’র অনুসন্ধানে লন্ডনের বাইরে হংকংয়ে নাসা গ্রুপের অর্থ পাচারের অকাট্য প্রমাণ মেলে। হংকংয়ের এম/এস এম.এন এন্টারপ্রাইজ এবং এম/এস ওয়ার্ল্ড টেক্সট্রিম সিও নামের দুটি প্রতিষ্ঠানে নাসা গ্রুপ গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানি করে। আবার রহস্যজনকভাবে এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেই বিভিন্ন গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ আমদানি করা হয়। এখানেই শেষ নয়, হংকংয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যাংক হিসাব থেকে পুনরায় লন্ডনে মজুমদারের ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। এতে তার অর্থ পাচারের বিষয়টি দালিলিকভাবে প্রমাণিত হয়। কিন্তু এসব প্রমাণ সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তখন মজুমদারের বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থ পাচারের জন্য নাসা গ্রুপের পোশাক রপ্তানি অর্ডার এবং সংশ্লিষ্ট সব অ্যাক্সেসরিজ আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র ওভার ইনভয়েসিং করা হয়। অনেকটা কুমিরের ছানা দেখানোর গল্পের মতো হংকংয়ে নিজের কোম্পানি থেকে বারবার পাঠানো হয় সব আমদানি ও রপ্তানি আদেশ। এসব অপকর্মে তার বিশস্ত সহযোগীর ভূমিকায় ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মামুন আব্দুল্লাহ। তিনি নিজেই হংকংয়ে বসে মজুমদারের এই অর্থ পাচার নেটওয়ার্ক দেখভাল করেন। পরে বিশ্বস্ততার পুরস্কার হিসাবে আব্দুল্লাহকে এক্সিম ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়।

এদিকে ট্রেড বেইসড (বাণিজ্যভিত্তিক) মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগে নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. আজাদ রহমান।

সিআইডি জানায়, নাসা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ফিরোজা গার্মেন্ট ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ১৩০টি এলসি/সেলস কন্ট্রাক্ট (বিক্রয় চুক্তি) গ্রহণপূর্বক এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও রপ্তানিমূল্য প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে না এনে যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের তথ্য সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যে অর্থ পাচারের মাধ্যমে লন্ডনের ফিলিমোর গার্ডেন এবং ব্রান্সউইক গার্ডেনে তার মেয়ে আনিকা ইসলামের নামে বাড়ি কেনার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 

 

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top