গত ১২ বছরে রেলের উন্নয়নে খরচ হয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। রেলে বিনিয়োগে অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেলেও সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে সামান্য। অনেক জায়গায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই চালানো হচ্ছে ট্রেন। এতে ছোট ভুলে ঘটছে বড় দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ সিগন্যাল ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়। সনাতন সিগন্যাল পদ্ধতি, পয়েন্টসম্যানের ভুল বা সিগন্যালম্যানের ভুলের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। বেশ কিছু জায়গায় ডিজিটাল সিগন্যাল পদ্ধতি চালু হলেও রেলের উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় সেসব এখন বন্ধ। বাধ্য হয়ে সনাতনী বা অ্যানালগ পদ্ধতিতে ট্রেন প্রবেশ বা ক্রসিং করানো হচ্ছে। এতে সামান্য ভুলেই বাড়ছে দুর্ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল সিগন্যাল পদ্ধতি সম্পূর্ণ চালু না হওয়া, রেলের কর্মচারীদের দক্ষ করে গড়ে না তোলা আর দায়িত্বহীনতাই এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
গত শুক্রবার গাজীপুরের জয়দেবপুর স্টেশনের দক্ষিণ আউটার সিগন্যালে ছোট দেওড়ার কাজীবাড়ি এলাকায় মালবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনায় যাত্রীবাহী টাঙ্গাইল কমিউটারের ৩টি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। লাইনচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৯টি বগি। দুর্ঘটনার সাড়ে ৩১ ঘণ্টা পর শেষ হয় উদ্ধারকাজ। এই ঘটনার পরদিনই শনিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম রেলওয়ে স্টেশনে কলকাতা থেকে ঢাকাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটি স্টেশনের ৫ নম্বর লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। দায়িত্বে থাকা স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যানের ভুল সিগন্যালের কারণে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী ধুমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনটি একই লাইনে প্রবেশ করে। তবে চালক একই লাইনে আরেকটি ট্রেন দেখতে পেয়ে দ্রুত থামিয়ে দেওয়ায় মুখোমুখি সংঘর্ষের হাত থেকে ট্রেন দুটি রক্ষা পায়।
গত শুক্রবার ঘটে যাওয়া গাজীপুরের রেল দুর্ঘটনার সঠিক কারণ জানতে রেলের সিওপিএস মো. শহীদুল ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি আঞ্চলিক কমিটি করা হয়েছে। আর রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী (সিগন্যাল ও টেলিকমিউনিকেশন) সৌমিক শাওন কবিরকে প্রধান করে আরেকটি পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা গাজীপুরে থাকা রেলের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলছেন। রোববার দুপুরে ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে প্রকৌশলীর কার্যালয়ে তদন্ত কমিটির কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে আসা রেলের দুজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা হয়েছে জাগো নিউজের।
তারা জানান, গাজীপুরে দুর্ঘটনা ভুল সিগন্যালের কারণে ঘটেছে। আগে থেকে যে মালবাহী একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল, যাত্রীবাহী ট্রেনের চালক সেটি জানতেন না। কারণ তাকে লাইন ক্লিয়ারের স্লিপ দেওয়া হয়েছে। যখন ভুল স্লিপ দেওয়া হয়েছে, যেহেতু সেখানে ডিজিটাল সিগন্যাল বন্ধ সেহেতু লাইনম্যানের সিগন্যাল দেওয়ার কথা ছিল। সেটিও দেওয়া হয়নি। এজন্য এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এসব নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী জাগো নিউজকে বলেন, গাজীপুরের দুর্ঘটনাস্থলে কাজ চলছিল, ডিজিটাল সিগন্যাল সিস্টেম বন্ধ ছিল। আরও কিছু জায়গায় প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় সেগুলোও ম্যানুয়ালি চলছে। যারা সিগন্যাল দেওয়ার দায়িত্বে তাদের ভুলে এরকম হচ্ছে। আমরা সবাইকে সতর্ক করছি। যেন এরকম ভুল আর না হয়।
স্টেশন মাস্টারদের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা দুর্বল ও ওয়াকিটকি কাজ না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কিছুদিন আগে জানতে পেরেছি কিছু ওয়াকিটকি কাজ করছে না। যেগুলো কাজ করছে না সেগুলো চেঞ্জ করে নিতে বলা হয়েছে। আর ওয়াকিটকির পাশাপাশি মোবাইলও দেওয়া আছে। যেহেতু ভুল হচ্ছে, আমরা মনিটরিং বাড়াচ্ছি।
এসব দুর্ঘটনা প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রম মাথায় রেখেই আমাদের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। একটি লাইনে আরেকটি ট্রেন ঢুকে যায়। এতে বড় ধরনরে দুর্ঘটনা ঘটে। রেলে পয়েন্ট এন্ড ক্রসিং এক-তৃতীয়াংশ এখনো কম্পিউটার সিস্টেমে করা হয়নি। উন্নয়ন কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। যেসব স্থানে ম্যানুয়ালি সিস্টেম করা, সেসব স্থান দ্রুত অটোমেশনের আওতায় আনতে হবে৷
এই অধ্যাপক বলেন, রেলে বিনিয়োগে ঘাটতি নেই। তবে পয়েন্ট অ্যান্ড ক্রসিং সিস্টেমে বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। সেখানে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তারা অপেশাদার, অদক্ষ। এসব কর্মচারীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে বেশি নজর দেই। রেলের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে আধুনিকায়ন করা জরুরি।
তিনি বলেন, উন্নয়ন কাজ শুরুর আগেই কর্তৃপক্ষের জানা ছিল যে এসব স্থানে ম্যানুয়ালি অপারেট করতে হবে। তাহলে কেন সেসব জনবলকে প্রশিক্ষিত করা হলো না! বিকল্প ব্যবস্থা তো রাখতে হবে। ট্রেনের লাইন ক্রসিংয়ের কাজটি যদি ম্যানুয়ালি করতে হয়, সেক্ষেত্রে অবশ্যই অপারেটরদের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করতে হবে।