২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৯ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

উৎপাদন বেশি, দাম কম—লোকসানে নীলফামারীর আলু চাষিরা

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ ও মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকিতে চলতি মৌসুমে নীলফামারী জেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে সম্ভাবনার সবুজ ছবি থাকলেও বাজারে সেই সাফল্য রূপ নিয়েছে হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসে। অস্বাভাবিক দরপতনের কারণে জেলার হাজারো আলু চাষি এখন চরম লোকসানের মুখে।

নীলফামারী সদর উপজেলার আলু চাষি আব্দুল আজিজ জানান, এক বিঘা জমিতে তিনি ৪০ থেকে ৪৫ বস্তা (প্রতি বস্তা ৬০ কেজি) আলু উৎপাদন করেছেন। অথচ বর্তমানে বাজারে প্রতি বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। এতে এক বিঘা জমি থেকে তার আয় দাঁড়াচ্ছে সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা, বিপরীতে উৎপাদন খরচ হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় তাকে গুনতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকারও বেশি লোকসান।

একই হতাশার কথা জানান ইউপি সদস্য ও আলু চাষি হাবিবুল্লাহ মিয়া। তিনি বলেন,
“ধারদেনা আর নিজের পুঁজি ঢেলে ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু এখন প্রতি কেজি আলুর দাম নেমে এসেছে ৪ থেকে ৫ টাকায়। এই আলু এখন আমাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তার আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষকই আলু চাষে অনীহা দেখাবেন।

জেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও চিত্র একই। ডোমার উপজেলার আলু চাষি একরামুল হক বলেন, “এবার আলুর ফলন সত্যিই ভালো হয়েছে। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে পানির দরে। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে আমার খরচ পড়েছে কমপক্ষে ১৪–১৫ টাকা, আর বিক্রি করছি ৭–৮ টাকায়। সার, বীজ, সেচ আর শ্রমিকের মজুরি দিতে গিয়ে ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছি। এখন সেই দেনা কীভাবে শোধ করব, বুঝতে পারছি না।”

একই রকম অসহায় কণ্ঠ শোনা যায় জলঢাকা উপজেলার আলু চাষি লোকমান হাকিমের কথায়। তিনি বলেন, “আলু চাষই আমাদের পরিবারের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এবার যে দাম পাচ্ছি, তাতে উৎপাদনের খরচই উঠছে না। হিমাগারে রাখার মতো সামর্থ্য নেই, তাই বাধ্য হয়ে লোকসানে আলু বিক্রি করছি।”

তিনি আরও যোগ করেন, “সংসার চালানো আর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। ন্যায্যমূল্য না পেলে আমাদের পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না।”

কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরু থেকেই আলুর বাজারে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কারসাজিতেই কৃষক পর্যায়ে দাম কৃত্রিমভাবে নিচে নামিয়ে রাখা হচ্ছে। মাঠে কৃষকের ঘাম ঝরলেও লাভ যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক
মো: মনজুর রহমান বলেন, “চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আলুর ফলন ভালো হয়েছে। এবার জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ৮৫০ হেক্টর, কিন্তু অর্জিত হয়েছে ২২ হাজার ৮১২ হেক্টর— যা গত বছরের তুলনায় ৯৬২ হেক্টর বেশি।”

তিনি জানান, ইতোমধ্যে আগাম জাতের আলু সংগ্রহ করা হয়েছে ৬ হাজার ২১২ হেক্টর জমি থেকে, যেখানে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন হয়েছে ১৫ দশমিক ১২ মেট্রিক টন। “উৎপাদনের দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি সফল মৌসুম,”— বলেন তিনি।

তবে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জেলা বিপণন দপ্তরের কৃষি বিপণন কর্মকর্তা
এ,টি,এম এরশাদ আলম খান জানান, “উৎপাদন বেশি হলে দাম কিছুটা কমে— এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কৃষক যেন উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে বাধ্য না হন, সে বিষয়ে আমরা নজর রাখছি। বাজারে সিন্ডিকেট বা অনিয়মের প্রমাণ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, আলু সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে হিমাগার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং সরকারি পর্যায়ে আলু ক্রয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বাম্পার ফলনের এই মৌসুমে কৃষকের মুখে হাসি ফোটার কথা থাকলেও বাস্তবতা তার বিপরীত। আজ নীলফামারীতে আলু চাষ মানেই লোকসান, দেনার চাপ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা। কৃষকদের একটাই দাবি— উৎপাদনের সাফল্যের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হোক, যাতে মাঠের ঘামে ফলানো ফসল আর লোকসানের বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top