মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডোমারে সিজারের বিল পরিশোধ করতে না পারায় নবজাতক বিক্রির মতো চরম অমানবিক চাপ দেওয়ার অভিযোগে একটি বেসরকারি ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পরপরই উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে অনিয়মের সত্যতা পেয়ে ক্লিনিকটিকে জরিমানা করেছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে ডোমার উপজেলা পরিষদ মার্কেটের “মমতা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার”-এ এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ভুক্তভোগী কৃষক রাকিবুল হাসানের স্ত্রী হাবিবা সুলতানা জানান, গত শুক্রবার রাতে প্রসব বেদনা নিয়ে তাকে ওই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। পরদিন সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম নেওয়ার পর রোববার ছাড়পত্রের সময় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত বিল পরিশোধে চাপ সৃষ্টি করে।
তাদের অভিযোগ, ভর্তির সময় ২২ হাজার টাকা খরচের কথা বলা হলেও অপারেশনের পর বিল পরিশোধ করতে না পারায় তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়। একপর্যায়ে প্রসূতি ও তার স্বজনদের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ ওঠে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—বিল পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় নবজাতক সন্তান বিক্রি করে টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্লিনিকটির চিকিৎসক ডা. ফারজানা আফরিন সুমীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশনায় গত দুই দিন ধরে সম্ভাব্য ক্রেতাদের ক্লিনিকে আনা হয়। তাদের মধ্যে কেউ ৩০ হাজার, কেউ ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব দেয়। পরিকল্পনা ছিল, ওই অর্থ থেকে একটি অংশ রেখে বাকি টাকা পরিবারকে দিয়ে নবজাতক হস্তান্তর করা হবে।
ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে সাংবাদিক ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্লিনিকটিতে দীর্ঘদিন ধরেই রোগীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও অনিয়ম চলছে। এ ধরনের জঘন্য ও মানবাধিকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তারা।
অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. ফারজানা আফরিন সুমী দাবি করেন, “বাচ্চা বিক্রির কোনো কথা বলা হয়নি। নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ না করায় রোগী ছাড়পত্রে বিলম্ব হচ্ছিল, সে বিষয়েই বলা হয়েছে।” তবে তদন্তে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. সোহান চৌধুরী বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করেন। প্রাথমিক তদন্তে নবজাতক বিক্রির অভিযোগসহ একাধিক গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী জানান, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ক্লিনিকটিতে দায়িত্বে অবহেলা, পর্যাপ্ত জনবলের অভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতিসহ নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে। এসব অপরাধে ক্লিনিকটিকে এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, “এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।