২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৭ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ঈদের আনন্দ ম্লান করে খোকসায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা: বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৪, আহত বহু

মোঃ নুর আলম পাপ্পু, খোকসা (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি:

পবিত্র ঈদুল আযহার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঘরমুখো মানুষের ব্যস্ততা যখন বেড়েছে, ঠিক সেই সময় কুষ্টিয়ার খোকসায় ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনা। মুহূর্তেই উৎসবের আনন্দ পরিণত হলো শোকের মাতমে। যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই মিনি ড্রাম ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ৪ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। শুক্রবার (২৩ মে ২০২৬) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা-কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া কুঠিপাড়া জামে মসজিদের সামনে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ী থেকে ছেড়ে আসা তালহা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস (রেজি: ঢাকা মেট্রো-ব-১৩-০০৯৩) শিমুলিয়া কুঠিপাড়া এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই একটি মিনি ড্রাম ট্রাকের (রেজি: বগুড়া-ড-১১-২৭০৩) সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় বাস ও ট্রাক দুটিই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়ক থেকে নিচে ছিটকে পড়ে। বিকট শব্দে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর্তনাদ।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষজন জীবনবাজি রেখে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে খোকসা ফায়ার সার্ভিস, খোকসা থানা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসক ও নার্সরা ঘটনাস্থল এবং হাসপাতালে ছুটে আসেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে অংশ নেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পর বাসের অনেক যাত্রী ভেতরে আটকা পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা স্থানীয় জনগণের সহায়তায় বাসের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ও ভেঙে আহতদের বের করে আনেন। আহতদের দ্রুত খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।

খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক ফরিদপুরের মুন্সী বাজার এলাকার মো. নাবিল (১৮) এবং একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে গুরুতর আহত ১১ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামের রাফিয়া খাতুন (১৪) এবং আরও একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি মারা যান। এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ জনে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। দুর্ঘটনার পর খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক হৃদয়স্পর্শী মানবিক চিত্র দেখা যায়। রক্তাক্ত ও আহত যাত্রীদের সাহায্যে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ সদস্য, ফায়ার সার্ভিস কর্মী এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন। আহতদের চিকিৎসা, স্বজনদের খোঁজখবর এবং জরুরি সেবায় সবাইকে নিরলসভাবে ছুটে বেড়াতে দেখা যায়।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে খোকসা এলাকায় এত বড় ও প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা খুব কমই ঘটেছে। ঈদকে সামনে রেখে এমন মর্মান্তিক ঘটনা পুরো উপজেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেক পরিবার ঈদের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত থাকলেও দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারে এখন শুধুই কান্না আর উৎকণ্ঠা।

দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।খোকসা থানা পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। নিহতদের মরদেহের আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ঈদের আগে ঘরে ফেরার আনন্দমুখর যাত্রাপথে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। খোকসার মানুষ এখন শোকাহত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top