রবিউল ইসলাম বাবুল, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ
পবিত্র ঈদের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় নেমে এসেছে এক পৈশাচিক অন্ধকারের ছায়া। সাত বছর বয়সী এক অবুঝ ও কোমলমতি শিশুকে ফুসলিয়ে গ্যারেজে নিয়ে পাশবিক নির্যাতনের (ধর্ষণ) এক লোমহর্ষক ও জঘন্য অভিযোগ উঠেছে ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের বিরুদ্ধে।
এই ঘৃণ্য অপরাধের প্রধান অভিযুক্ত আবু তালেব (৬০) নামের এক ব্যাটারিচালিত ভ্যানচালককে অবশেষে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে হাতিবান্ধা থানা পুলিশ।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) ভোররাতে হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের আদর্শ গ্রাম এলাকায় এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাকে তার নিজ বাসস্থান থেকে খাঁচাবন্দি করে থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত লম্পট আবু তালেবওই এলাকার মৃত শিয়াল শেখের ছেলে।
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ মে (পবিত্র ঈদুল আযাহার পরের দিন) চারপাশের উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে শিশুটি তার সমবয়সী বন্ধুদের সাথে আনন্দে মেতে উঠেছিল। বিকেল গড়িয়ে এলে সে তার নানার সেলুনের দোকান থেকে সামান্য কিছু হাতখরচ (২০ টাকা) নিয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
পথিমধ্যে পরিচিত এবং বয়সে প্রবীণ হওয়ার সুবাদে ভ্যানচালক আবু তালেবকে দেখে শিশুটি কোনো প্রকার সন্দেহ করেনি। অভিযুক্ত আবু তালেব তাকে নিরাপদ ও সযত্নে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে নিজের ব্যাটারিচালিত ভ্যানে তুলে নেয়। কিন্তু অবুঝ শিশুটি কল্পনাও করতে পারেনি যে, যাকে সে দাদু বা চাচা বলে সম্বোধন করে, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক হিংস্র ও কামাতুর পিশাচ।
বাড়ি নিয়ে যাওয়ার নাম করে পথিমধ্যে সুকৌশলে শিশুটিকে একটি নির্জন করাতকলের (সমিলে) গ্যারেজের ভেতরে নিয়ে যায় আবু তালেব। সেখানে নির্জনতার সুযোগ নিয়ে ওই অসহায় শিশুটির ওপর তীব্র পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ চালানো হয়। শিশুটির আর্তচিৎকার যেন করাতকলের দেয়াল ভেদ করে বাইরে না আসতে পারে, সেজন্য সব ধরনের বর্বরতা চালায় ওই লম্পট। পৈশাচিক লালসা চরিতার্থ করার পর রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থায় শিশুটিকে সেখানে ফেলে রেখে চম্পট দেয় অভিযুক্ত ভ্যানচালক।
কোনো মতে নরপশুর হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে রক্তাক্ত ও ক্রন্দনরত অবস্থায় শিশুটি পায়ে হেঁটে নিজের বাড়িতে পৌঁছায় এবং তার নানিকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে তার ওপর ঘটে যাওয়া এই নারকীয় নির্যাতনের বিবরণ দেয়। ঘটনার ভয়াবহতায় শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে পরিবারের লোকজন তাকে তাৎক্ষণিকভাবে হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
হাতিবান্ধা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা শিশুটির শরীরের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে লালমনিরহাট জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।
হাতিবান্ধা থানার অফিসার ইনচার্জ এর ভাষ্যমতে মেডিকেল শেষে বর্তমানে মিশুটি নিজ বাড়ীতে চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে আছেন। এই ঘটনায় পুরো হাতিবান্ধা উপজেলা ভুক্তভোগীর পরিবারে কান্নার রোল পড়েছে।
এই পৈশাচিক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই গত ২৯ মে হাতীবান্ধা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আসামির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়।মামলা নম্বর হাতি-১ ঘটনার পর থেকেই অপরাধী আবু তালেব এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে থাকে।
হাতীবান্ধা থানার অফিসার ইনচার্জ রমজান আলী দৈনিক আমার বাংলাদেশ সাংবাদিক কে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক পুলিশ জানার পর থেকেই আসামিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য সর্বোচ্চ তৎপরতা শুরু করে। যেহেতু এলাকায় ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল, তাই পুলিশ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আজ মঙ্গলবার ভোরে আদর্শ গ্রাম এলাকায় আসামির গোপন আস্তানায় হানা দেয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
ওসি আরও নিশ্চিত করেন যে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আজ দুপুরের দিকেই ধৃত আসামিকে কঠোর পুলিশি পাহারায় বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
এদিকে একজন ষাট বছর বয়সী বৃদ্ধ কর্তৃক সাত বছরের এক অবুঝ শিশুকে এভাবে ধর্ষণের ঘটনায় পুরো লালমনিরহাট জেলা জুড়ে তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নেটিজেনরা ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।
স্থানীয় সচেতন মহল, মানবাধিকার কর্মী এবং এলাকাবাসী আজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “সমাজে যখন আবু তালেবের মতো বৃদ্ধদের কাছ থেকে শিশুরা নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার কথা, তখন তাদের কাছ থেকেই যদি এমন পৈশাচিকতার শিকার হতে হয়, তবে আমাদের কন্যারা কোথায় নিরাপদ?”
হাতিবান্ধা উপজেলাবাসী প্রশাসনের কাছে এই লম্পট ও ধর্ষকের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নরপশু এমন জঘন্য কাজ করার দুঃসাহস না দেখায়।