মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে যাওয়া বাসটি উদ্ধার করা হয়েছে। ফেরিতে ওঠার আগে সব যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গেছে।
শুক্রবার (৫ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এদিন বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজার সহায়হায় বাসটি উদ্ধার করা হয়। চালক ও হেলপারকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
বাসের যাত্রী হীরক আহমেদ বলেন, আমি আমার স্ত্রী ও বাচ্চাসহ মোট ৪ জন কুষ্টিয়া থেকে এসবি পরিবহন বাসে উঠি। বাসে যাত্রী ছিল ৩৮ জনের মতো। বাসটি সকাল ৭টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্য ছেড়ে আসে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমাদের বাসটি দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাটে এসে পৌঁছালে ড্রাইভার হেলপার বাদে সব যাত্রী বাস থেকে নেমে যায়। পরে বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এসবি পরিবহনের ঢাকাগামী বাসটি দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাট পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে যায়। এখন পর্যন্ত নিখোঁজের সংবাদ পাওয়া যায়নি। বাস থেকে সব যাত্রী নামানো হয়েছিল।

জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, আড়াই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় পদ্মায় পড়ে যাওয়া বাসটিকে নদী থেকে তোলা হয়েছে। কোনো যাত্রী বাসে ছিল না তাই হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। যাত্রীদের মালামালগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা এখন যাচাই-বাছাই করে যাত্রীদের মালামালগুলো বুঝিয়ে দেব। সবার প্রতি অনুরোধ আপনারা সচেতন থাকবেন।ফেরিতে ওঠার সময় বাস থেকে নেমে যাবেন এবং লঞ্চে যেন অতিরিক্ত যাত্রী না ওঠে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বাসের এক নারী যাত্রী বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রী টিউলিপ বলেন, আমি কুষ্টিয়া থেকে বাসে উঠেছি। গাড়ী ভরা যাত্রী ছিল ঘাঠে এসে ফেরীতে উঠার আগে বাস থেকে সব যাত্রীকে নামিয়ে দেয়া হয়। আমি লাষ্ট বাস থেকে নামছি আমার পরে কেউ বাসে ছিল না। বাসে শুধু হেলপার আর ড্রাইভার ছিল। বাসটি নন এসি ছিল। কুষ্টিয়া থেকে বাসটি সাত টায় ছাড়ে।
বিজিবি সদর দপ্তরের নুর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, বাসের সব যাত্রীকে নামিয়ে দেয় নৌ-পুলিশ। অনেক যাত্রী নামতে অনীহা প্রকাশ করে। তবে যাত্রীদের স্ব-উদ্যোগে নামা উচিত। আজ না নামলে বড় ধরণের দুঘর্টনা ঘটতো। এখন মনে হচ্ছে পুলিশের আহবান না শুনে বাসে থাকলে বড় দুঘর্টনা ঘটতো।
এসবি পরিবহনের চালক (ড্রাইভার ) ঝন্টু আলী বলেন, ফেরিতে উঠার আগে সব যাত্রী বাস থেকে নামিয়ে দেই। শুধু হেলপার ও আমি ছিলাম। ফেরিতে উঠার সময় হঠাৎ করে দেখতে পাই ব্রেকে কোন কাজ করছে না। আমি হেলপারকে দ্রুত নেমে যেতে বলি। পরে আমিও লাফ দিয়ে নদীতে পড়ে যাই। সাতরে জনগনের সহায়তায় রক্ষা পাই।
হেলপার শাকিল হোসেন বলেন, বাস থেকে যাত্রী নামিয়ে টান দেওয়ার সাথে সাথেই ড্রাইভার আমাকে বলে ব্রেক ফেইল করেছে দ্রুত নেমে পড়ো। আমিও নামনে না পেরে নদীতে পড়ে যাই। আমার পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছে। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাথী দাস বলেন, ফায়ার সার্ভিস, নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ, ডুবুরী দল, বিআইডব্লিউটিএ সহ সকলের প্রচেষ্টায় দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছে। যাত্রীদের মালামাল আমরা প্রমাণ সাপেক্ষে বুঝে দিয়েছি।
নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বলেন, নৌ-পুলিশের তৎপরতার কারণে বাস থেকে আগেই যাত্রীরা নেমে যায়। এ কারণে বড় দুঘর্টনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।
রাজবাড়ী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, পিপিএম (সেবা) বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বড় ধরণের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। যাত্রী, চালক ও সবাইকে আরও সতর্ক হতে হবে।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, এ ধরণের দুর্ঘটনা কাম্য নয়। আমরা কঠোর ভাবে যাত্রী নামিয়ে ফেরিতে উঠার নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছি। এ দুঘর্টনা তদন্তে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। আগামী ৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেন, আজকের দুঘর্টনায় কোন নিহতের ঘটনা ঘটেনি। দুঘর্টনার কারণ অনুসন্ধানে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭ সদস্য বিশিষ্ট আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আজ সচেতনতার কারণে বড় দুঘর্টনার হাত থেকে রক্ষা পেল।
এর আগে গত ২৫ মার্চ কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা সোহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ফেরি ঘাটে উঠতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এ ঘটনায় বাসের ২৬ জন যাত্রী প্রাণ হারান।