মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
বাবাকে হারিয়েছেন ছোটবেলায়। পৈতৃক সম্পত্তি থেকেও হয়েছেন বঞ্চিত। জীবনের নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে একটি ছোট্ট বসতভিটাকেই শেষ সম্বল হিসেবে আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলেন তাজমিন বেগম ও তার মা গোলেনুর বেগম। কিন্তু আজ সেই আশ্রয়টুকুও হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার ধরেয়ার বাজার এলাকায় আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে বিরোধপূর্ণ জমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। আদালতের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ এবং পুলিশের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নির্মাণকাজ চলতে থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছে একটি দরিদ্র পরিবার।
স্থানীয় সূত্র ও মামলার নথি থেকে জানা যায়, তাজমিন বেগমের বাবা রজব আলী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে শৈশবেই পিতৃহারা হন তিনি। পরে নানা পারিবারিক জটিলতায় বাবার সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত হন। জীবন-সংগ্রামে টিকে থাকতে তার মা গোলেনুর বেগম ঢাকায় অন্যের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন। সেই কঠিন সময়ে তাজমিনের মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই করে দিতে বড় চাচা সুরত আলী প্রায় দেড় শতক জমি দান করেন। সেই জমিতেই প্রায় ১৮ বছর ধরে বসবাস করে আসছিল পরিবারটি।
কিন্তু সম্প্রতি সেই বসতঘর ভেঙে নতুন করে ঘর নির্মাণের অভিযোগ ওঠে তাজমিনের চাচাতো ভাই রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে। এতে একমাত্র আশ্রয় হারানোর আতঙ্কে দিন কাটছে মা-মেয়ের।
তাজমিন বেগমের স্বামী শফিকুল ইসলাম জানান, জীবিকার প্রয়োজনে গোলেনুর বেগম ঢাকায় থাকলেও গ্রামের ওই ভিটাটিই তাদের একমাত্র ঠিকানা। সেখানে ফিরে আসার স্বপ্ন নিয়েই বছরের পর বছর কষ্ট করে যাচ্ছেন তিনি। অথচ এখন সেই ভিটাটুকু নিয়েই শুরু হয়েছে টানাপোড়েন।
এ ঘটনায় তাজমিনের শ্বশুর ও আপন চাচা হযরত আলী আদালতের দ্বারস্থ হলে নীলফামারীর বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪/১৪৫ ধারায় বিরোধপূর্ণ জমিতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখারও আদেশ দেওয়া হয়।
আদালতের নির্দেশের পর কিশোরগঞ্জ থানার এএসআই (নিঃ) জয় শংকর শর্মা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই নির্দেশ অমান্য করেই নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বাদী হযরত আলী বলেন, “তাজমিন আমার ভাতিজি, আবার পুত্রবধূও। মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করে বড় হয়েছে। তার বাবা মারা যাওয়ার পর আমার বড় ভাই মানবিক কারণে তার নামে জমি লিখে দেন। এখন সেই জমিটুকুও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে ওদের আর কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না।”
অভিযোগের বিষয়ে ছফের আলীর ছেলে রবিউল ইসলাম দাবি করেন, জমিটি তাদের বৈধভাবে ক্রয় করা সম্পত্তি এবং তারা নিজেদের জমিতেই ঘর নির্মাণ করছেন। আদালতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করা হবে বলেও তিনি জানান।
তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসআই (নিঃ) জয় শংকর শর্মা বলেন, “আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। এরপরও নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন।”
কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফর রহমান বলেন, “ঘটনার বিষয়ে অবগত রয়েছি। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।”
এদিকে তাজমিন ও তার মায়ের চোখে এখন শুধু অনিশ্চয়তা। আদালতের নির্দেশ কার্যকর হবে কি না, শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা পাবে কি না— সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মনে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না হলে বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। একটি অসহায় পরিবারের দাবি একটাই— আদালতের নির্দেশ যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবেও কার্যকর হয়, আর তাদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু যেন রক্ষা পায়।