৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২২শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

আগুনে বৃদ্ধের মৃত্যু ঘিরে উত্তাল সৈয়দপুর

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

নীলফামারীর সৈয়দপুরে নির্মাণাধীন একটি বাড়িতে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আফাজ উদ্দিন (৬২) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর পর মামলা গ্রহণে পুলিশের গড়িমসির অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। নিহতের লাশ নিয়ে থানার সামনে অবস্থান, বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, ঘটনার তিন দিন পরও মামলা গ্রহণ করা হয়নি; বরং বিষয়টি আপস-মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (৮ জুন) দুপুরে উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের কাচারীপাড়া এলাকা থেকে নিহতের মরদেহ নিয়ে শতাধিক নারী-পুরুষ বিক্ষোভ মিছিলসহ সৈয়দপুর শহরে প্রবেশ করেন। প্রায় সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তারা সৈয়দপুর থানার প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন এবং শেরে বাংলা সড়কে অবরোধ গড়ে তোলেন।

বিক্ষোভকারীদের অবস্থানের ফলে সৈয়দপুর-নীলফামারী মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে এবং থানা চত্বরসহ আশপাশের এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

স্থানীয় সূত্র ও পরিবার জানায়, গত ৩ জুন ভোররাত প্রায় ৪টার দিকে কাচারীপাড়া এলাকায় আফাজ উদ্দিনের বড় ছেলে নুর হোসেনের নির্মাণাধীন বাড়িতে দুর্বৃত্তরা পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধারণা করা হয়, হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিল নুর হোসেন। তবে তিনি ওই রাতে সেখানে অবস্থান না করায় আগুনের শিকার হন তার বাবা আফাজ উদ্দিন।

দগ্ধ অবস্থায় প্রথমে তাকে সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য একই দিন ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। টানা চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত শনিবার দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

নিহতের ছোট ছেলে আবু বকর সিদ্দিক অভিযোগ করে বলেন, প্রায় পাঁচ মাস আগে গাছের ঝরা পাতা কুড়ানোকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী আব্দুস সালাম চঞ্চলের সঙ্গে তাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। সেই ঘটনার জের ধরে ধারাবাহিকভাবে তাদের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।

তার দাবি, ঘটনার আগের রাতে তারাগঞ্জ বাজার এলাকায় তার বড় ভাই নুর হোসেনকে মারধর করা হয়। এরপর পরিকল্পিতভাবে প্রতিশোধ নিতে নির্মাণাধীন বাড়িতে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন দেওয়া হয়। কিন্তু লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তি সেখানে না থাকায় নিরীহ বৃদ্ধ আফাজ উদ্দিন ভয়াবহ আগুনে দগ্ধ হন।

আবু বকর বলেন, “আমার বাবা বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। আমরা বিচার চেয়ে থানায় গিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও মামলা নেওয়া হয়নি। উল্টো বিষয়টি মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশ সময়মতো মামলা গ্রহণ করলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো। এ কারণে তারা শুধু মামলা নথিভুক্ত করেই ক্ষান্ত হননি, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম রেজার অপসারণ দাবিও জানান।

এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সৈয়দপুর থানার ওসি রেজাউল করিম রেজা বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। আহত ব্যক্তির চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পরিবারের পক্ষ থেকে শুরুতে কেউ লিখিত অভিযোগ দিতে আসেননি।

তিনি বলেন, “পরবর্তীতে একটি এজাহার জমা দেওয়া হলেও তাতে কিছু আইনি ও তথ্যগত ত্রুটি ছিল। সংশোধনের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি পুলিশ নিজেরাই এজাহার সংশোধনে সহায়তা করতে চাইলেও তারা রাজি হয়নি। আজ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পর মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে অভিযুক্ত আব্দুস সালাম চঞ্চল ও তার পরিবারের সদস্যরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, পূর্বশত্রুতার জেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই এবং তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একজন বৃদ্ধের মর্মান্তিক মৃত্যু, মামলা গ্রহণ নিয়ে বিতর্ক এবং লাশ নিয়ে থানা ঘেরাওয়ের মতো নজিরবিহীন ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top