তারেক আজিজ লিংকন, নিজস্ব প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে গত ২৪ মে গভীর রাতে নির্মাণাধীন যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে এক ভয়াবহ ও পরিকল্পিত সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনী। প্রায় ৩০০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র একে-৪৭, চাইনিজ রাইফেল এবং এক্সকাভেটর (মাটি কাটার যন্ত্র) নিয়ে একযোগে এই হামলা চালায়। উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা ক্যাম্পটিকে পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর এই দুঃসাহসিক হামলা জঙ্গল সলিমপুরের দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল অবৈধ রিয়েল এস্টেট ও অপরাধ সাম্রাজ্যের অন্ধকার চিত্রকে আবারও সামনে এনেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩১ মে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই অস্থায়ী ক্যাম্পটি উদ্বোধন করার কথা ছিল এবং এর ৯০ শতাংশ কাজই সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। হামলাকারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের ওপর কৌশলগত অবস্থান (কভার) নিয়ে ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে। এমনকি যৌথবাহিনীর রিইনফোর্সমেন্ট বা অতিরিক্ত সাহায্য যেন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে, সেজন্য আগেই রাস্তার চার-পাঁচটি পয়েন্ট কেটে নালা ও কালভার্টের স্ল্যাব ভেঙে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনী আত্মরক্ষার্থে ১০৪ রাউন্ড পাল্টা গুলি চালালেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে প্রায় ৪,০০০ সদস্যের এক বিশাল যৌথ অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই অভিযানের তথ্যও আগেভাগে সন্ত্রাসীদের কাছে ফাঁস হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে মূল দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী এবং রোকন বাহিনীর প্রধান রোকনুদ্দিনসহ শীর্ষনেতারা এখনো পলাতক রয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত প্রায় ৩,১০০ একরের এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলটি সরকারি কাগজে খাস জমি। কিন্তু বাস্তবে গত ২০-২৫ বছরে এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভেতরে এক ‘আলাদা রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছিল, যেখানে প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
শুরুতে প্রতি প্লট মাত্র ২০,০০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রায় ১৫টি সমবায় সমিতির আড়ালে এই বিশাল ভূমি বাণিজ্য পরিচালিত হতো, যার মূল হাতিয়ার ছিল ‘আলীনগর মাল্টিপারপাস কোঅপারেটিভ সোসাইটি’। এই সাম্রাজ্যের দখলদারিত্ব ও চাঁদার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইয়াসিন গ্রুপ এবং রোকনুদ্দিন গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রক্তক্ষয়ী ‘টার্ফ ওয়ার’ বা আধিপত্যের লড়াই চলছে। গত ১৭ মাসেই এই পাহাড়ে অন্তত ৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
তদন্তে দেখা গেছে, একজন সাধারণ মিল শ্রমিক থেকে মোহাম্মদ ইয়াসিনের কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে ওঠার পেছনে ছিল রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের অনুসারী হিসেবে এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন দলের নাম ব্যবহার করে সে পার পাওয়ার চেষ্টা করে।
এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ওসিসহ ২০ জন কর্মকর্তা হামলার শিকার হয়েছিলেন, যার কোনো কার্যকর বিচার হয়নি। এই ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ এবং বারবার পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭ এর উপপরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। র্যাব কর্মকর্তার এই হত্যাকাণ্ডই জঙ্গল সলিমপুরকে স্থানীয় অপরাধের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপ দেয়।
শুধু অপরাধের অভয়ারণ্যই নয়, জঙ্গল সলিমপুরে অবাধে পাহাড় কাটার ফলে এক নীরব পরিবেশগত বিপর্যয় চলছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে এই অঞ্চলে পাহাড়ধসের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে পলি মাটির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।
হামলার পর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা রয়েছে। অপরাধীদের স্থায়ীভাবে দমন করতে সেখানে দেশের আধুনিকতম কারাগার-২, একটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, মডেল মসজিদ ও নবথিয়েটারসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের ধারণা, রাষ্ট্রীয় বড় স্থাপনা তৈরি হলে অপরাধীদের মনোবল ভেঙে যাবে।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যুগ যুগ ধরে সেখানে বসবাস করে আসা প্রায় দেড় লাখ নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে এখন তীব্র উচ্ছেদ আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে শুধু বুলেটের জোরে এই অপরাধ সাম্রাজ্য নির্মূল করা কঠিন হবে। জঙ্গল সলিমপুরের এই সংকট এখন কেবল কোনো আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সুশাসন এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংকল্পের এক বড় পরীক্ষা।