১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৩রা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সংবাদ প্রকাশের পর বদলে গেল বৃদ্ধ লুৎফর রহমানের ভাগ্য, জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে বৃদ্ধাশ্রমে পুনর্বাসন

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে রাস্তার পাশে পলিথিনে ঘেরা ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবন কাটানো নীলফামারীর অসহায় বৃদ্ধ লুৎফর রহমান চৌধুরীর জীবনে অবশেষে আশার আলো ফুটেছে। দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে তাঁর করুণ জীবনসংগ্রামের সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসনের মানবিক হস্তক্ষেপে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছে তাঁর।

নীলফামারী সদর উপজেলার কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের বাড়োঘড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ৬০ ঊর্ধ্ব লুৎফর রহমান চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত অবস্থায় জীবনযাপন করছিলেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে অসহায় হয়ে পড়েন। একসময় মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে সদর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ডোমার সড়কসংলগ্ন নটখানা এলাকায় একটি বাউন্ডারি ওয়ালের পাশে পলিথিন, ছেঁড়া ব্যানার ও খড়কুটো দিয়ে তৈরি ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নেন।

সেখানে নেই বিদ্যুৎ, নেই নিরাপদ বাসস্থান, নেই নিয়মিত খাবার কিংবা চিকিৎসার ব্যবস্থা। ঝড়-বৃষ্টি, প্রচণ্ড গরম ও শীত উপেক্ষা করে বছরের পর বছর মানবেতর পরিবেশে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। জীবিকার তাগিদে রাস্তাঘাট থেকে পলিথিন ও পরিত্যক্ত সামগ্রী কুড়িয়ে বিক্রি করেই চলছিল তাঁর জীবনসংগ্রাম।

সম্প্রতি দৈনিক আমার বাংলাদেশ সহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে লুৎফর রহমানের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র প্রকাশিত হলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সংবাদ প্রকাশের পর স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবী ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলো তাঁর পাশে দাঁড়াতে শুরু করে।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান ব্যক্তিগত উদ্যোগে লুৎফর রহমানের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। বুধবার (১৭ জুন) তাঁকে গোসল করিয়ে নতুন পোশাক পরানো হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সামগ্রী প্রদান করে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, বৃদ্ধাশ্রমে তাঁর থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও কষ্টের জীবন থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এখন নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে জীবনযাপনের সুযোগ পাবেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জেলা প্রশাসকের এ মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি শুধু একজন অসহায় বৃদ্ধের পুনর্বাসন নয়, বরং মানবিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক সচেতনতা এবং গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকারও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, “যে মানুষটি বছরের পর বছর সমাজের চোখের আড়ালে কষ্টে দিন কাটিয়েছেন, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে জেলা প্রশাসক যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে, সমাজ ও রাষ্ট্র চাইলে একজন অসহায় মানুষের জীবনও বদলে দিতে পারে।”

একসময় যে ঝুপড়ি ঘর ছিল লুৎফর রহমানের একমাত্র আশ্রয়, আজ সেই জীবন পেরিয়ে তিনি পেয়েছেন নিরাপদ আবাসন, প্রয়োজনীয় সেবা এবং নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। তাঁর এই পুনর্বাসন মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পথে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top