মো সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নীলফামারীর পশুর হাটগুলোতে কোরবানির পশু আমদানি বাড়লেও এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি বেচাকেনা। জেলার ঐতিহ্যবাহী বড় হাটগুলোতে পশুর সরবরাহ থাকলেও তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের উপস্থিতি। দালালদের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত হাসিল আদায়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নানা হয়রানির কারণে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের একাংশ হাটবিমুখ হয়ে পড়েছেন। ফলে দিন দিন বাড়ছে খামারনির্ভর পশু কেনাবেচা।
শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে নীলফামারীর অন্যতম বৃহৎ বসুনিয়াহাট ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় গরুর আমদানি থাকলেও বেচাকেনা কম। হাটজুড়ে দেশি বিভিন্ন জাতের গরু, মহিষ ও ছাগল উঠলেও ক্রেতাদের মধ্যে আগের মতো উৎসাহ নেই। অনেক বিক্রেতাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পশু বিক্রি করতে দেখা যায়নি।
ঢাকা, মানিকগঞ্জ ও চট্টগ্রাম থেকে আসা পাইকার রফিকুল ইসলাম ও নুরন্নবি জানান, আগে ঈদের অন্তত ১৫-২০ দিন আগে থেকেই নীলফামারীর হাটগুলো জমে উঠত। কিন্তু এবার অতিরিক্ত হাসিল, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং দালালদের উৎপাতের কারণে ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সদরের ডুগডুগি এলাকা থেকে গরু নিয়ে আসা বিক্রেতা হাসেম আলী বলেন, “সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছি, কেউ শুধু দাম জিজ্ঞেস করে চলে যাচ্ছে। এখনো একটি গরুও বিক্রি করতে পারিনি।”
হাটে গরু দেখতে আসা সরকারি চাকরিজীবী নূর ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “দালালদের কারণে স্বাভাবিকভাবে দরদাম করা যায় না। অনেক সময় পছন্দের গরু কিনতেও অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান আসাদুল হক ও লিটন মিয়া। তারা বলেন, “এখন অনেকেই খামারে গিয়ে আগেই গরু বুকিং দিচ্ছেন। সেখানে ঝামেলা কম, পশুর পরিচর্যা সম্পর্কেও নিশ্চিত থাকা যায়।”
এদিকে, হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন বিক্রেতারা। এমনকি কিছু হাটে রশিদ দিলেও সেখানে আদায়কৃত টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পশু বিক্রেতা সফিকুল ইসলাম বলেন, “গতবারের তুলনায় এবার গরুর দাম কিছুটা কম। ক্রেতারা আসছেন, তবে বেশিরভাগই দরদাম যাচাই করে চলে যাচ্ছেন।” তবে চট্টগ্রাম থেকে আসা গরুর ব্যাপারী মুসা জানান, তিনি বসুনিয়াহাট থেকে ১৫টি গরু কিনেছেন। তার ভাষায়, “বড় গরুর দাম তুলনামূলক কম হলেও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। এখানকার পরিবেশ ও মানুষের ব্যবহার ভালো।”
বসুনিয়াহাটের ইজারাদার জাহেরুল ইসলাম জানান, গত সোমবারের হাটে প্রায় ৪ হাজার গরু উঠলেও বিক্রি হয়েছে মাত্র ৭৫০টি। শুক্রবারের হাটে প্রায় ১০ হাজার গরু আমদানি হলেও বিক্রি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি। অথচ অন্যান্য বছর এই সময়ে কয়েক হাজার পশু বিক্রি হতো।
তিনি বলেন, “আগে হাটের দিন শতাধিক ট্রাকে গরু দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। এবার গেছে মাত্র ৩০টি ট্রাক।”
হাটের অবকাঠামোগত সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের দুর্ভোগ বাড়ছে বলে জানান। দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের দাবি জানান সংশ্লিষ্টরা।
ইজারাদারের প্রতিনিধি মো. শিহাবুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “হাটে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা কাজ করছি। সামনে ঈদ ঘনিয়ে এলে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে আশা করছি।”
অপরদিকে, ডোমার উপজেলার আমবাড়ি পশুহাটেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। হাটটির ইজারাদার আরিফুল ইসলাম আরিফ বলেন, “বৃষ্টির কারণে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। এছাড়া শহরের মানুষ এখন সরাসরি খামার থেকে পশু কিনছেন।”
হাটে আসা কয়েকজন ক্রেতা ও বিক্রেতা অভিযোগ করেন, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবার জন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগের পর্যাপ্ত মেডিকেল টিম চোখে পড়েনি। পাশাপাশি ব্যাংক বুথ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক তদারকি বাড়ানোর দাবি জানান তারা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষে নীলফামারীতে ৪১টি পশুর হাট বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি স্থায়ী ও ১০টি অস্থায়ী হাট। পাশাপাশি অনলাইনে পশু কেনাবেচার জন্য চালু রয়েছে ছয়টি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর জেলার ৩৪ হাজার ৮০৩টি বাণিজ্যিক ও পারিবারিক খামারে মোট ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৫০টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মাঠে কাজ করছে ২০টি মেডিকেল টিম।
ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী বলেন, “বসুনিয়াহাটে বৃষ্টির সময় কাদার সমস্যা রয়েছে। বিষয়টি জানা আছে, দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
নীলফামারী পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ হোসেন খান বলেন, “পশুর হাটে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প থাকবে। জাল নোট শনাক্তের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নির্ধারিত হাসিলের হার সাইনবোর্ডে টাঙাতে হবে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সাদা পোশাকে পুলিশ তৎপর থাকবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোরবানির পশুর বাজারকে ক্রেতাবান্ধব রাখতে হলে দালাল নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত হাসিল বন্ধ, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় ঐতিহ্যবাহী পশুর হাটগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।