মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীতে স্বামীর বিরুদ্ধে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে হত্যাচেষ্টার শিকার গৃহবধূ বীথি আক্তার (২৫) অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন। টানা সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেল ৩টার দিকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। পলাতক স্বামী সাজু খানের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা।
নিহত বীথি আক্তার জেলার সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের নিজামের চৌপথী বড়বাড়ি গ্রামের বাবুল হোসেনের মেয়ে। শনিবার (১৭ মে) সকালে বাবার বাড়িতে তার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় পাঁচ বছর আগে একই উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের সোনাখুলী জামবাড়ি গ্রামের নজরুল ইসলাম চেল্লুর ছেলে সাজু খানের সঙ্গে বীথির বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের আব্দুর রহমান নামে তিন বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। সাজু খান পেশায় মাহিন্দ্রা ট্রাক্টরের মেকানিক। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি নীলফামারী শহরের গাছবাড়ী এলাকায় ইকবাল হোসেনের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে বীথির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন সাজু খান ও তার পরিবারের সদস্যরা। একাধিকবার স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা হলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি।
স্বজনদের অভিযোগ, গত ৯ মে রাত আনুমানিক ৮টার দিকে পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে সাজু খান ঘরে থাকা পেট্রোল বীথির শরীরে ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে ঘরের গেটে তালা লাগিয়ে তিন বছরের শিশুপুত্রকে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান তিনি।
প্রতিবেশী নাজমিন বেগম আগুন দেখতে পেয়ে চিৎকার দিলে স্থানীয়রা ছুটে এসে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় বীথিকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাকে নীলফামারী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয় তার।
এ ঘটনায় নীলফামারী সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নম্বর-১৭৫। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামী সাজু খান পলাতক রয়েছে। তবে পালিয়ে যাওয়ার আগে তিনি গোপনে এক বন্ধুর মাধ্যমে শিশু সন্তান আব্দুর রহমানকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
নিহতের মা মাদুসা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “বিয়ের পর থেকেই আমার মেয়েকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতো। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে আমরা বহুবার টাকা-পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করেছি। কিন্তু তারপরও অত্যাচার থামেনি। শেষ পর্যন্ত আমার মেয়ের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই হত্যার বিচার চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত নৃশংস ও মর্মান্তিক। একজন নারীকে এভাবে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনায় দোষীর দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে নীলফামারী সদর থানার (ওসি) জিল্লুর রহমান জানায়, মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।