১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার মিলনমেলা, কায়রোতে ছারছীনা দরবারের পীর সাহেবকে সংবর্ধনা

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান:

মিশরের রাজধানী কায়রোতে এক আধ্যাত্মিক, মানবিক ও আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ এবং দোয়া মাহফিল। বৃহস্পতিবার (১৮ তারিখ) সন্ধ্যায় কায়রোর গ্র্যান্ড কনফারেন্স হল, বুরজ আত-তাতবিকিয়্যিনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিভিন্ন দেশের আলেম, গবেষক, শিক্ষার্থী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

ছারছীনা দারুসসুন্নাত সোসাইটি, আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মরহুম মুজাদ্দিদে জামান, আলহাজ শাহ সূফি মোহাম্মাদ মোহেব্বুল্লাহ রহ. এর জীবন, কর্ম, আধ্যাত্মিক অবদান ও ইসলামী সমাজ সংস্কারে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনায় ঈসালে সাওয়াব ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান মেহমান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম সুপ্রাচীন আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ছারছীনা দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন, আলহাজ হযরত মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছারুদ্দীন আহমদ হুসাইন (হাফিজাহুল্লাহ)।

ছারছীনা দারুসসুন্নাত সোসাইটির আহ্বায়ক সাইমুম আল-মাহদী আল-আযহারীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে। তিলাওয়াত করেন মিশরের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইমাম ও খতিব, ক্বারী শায়খ মোহাম্মাদ সাঈদ। পরে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন সাইফুর রহমান আল-আযহারী।

বক্তারা বাংলা, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় ছারছীনা শরীফের শতবর্ষব্যাপী দ্বীনি খেদমত, শিক্ষা বিস্তার, তাসাউফ চর্চা, মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং মরহুম শাহ মোহাম্মাদ মোহেব্বুল্লাহ রহ. এর জীবনাদর্শ ও তাজদিদি মিশনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁরা বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা, সমাজ সংস্কার এবং আধ্যাত্মিক জাগরণে তাঁর অসামান্য অবদানের কথাও স্মরণ করেন।

অনুষ্ঠানে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রায় বিশটি দেশের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ছিল রুয়াসাউল ইত্তেহাদ, বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত, বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, আল-আযহার স্টুডেন্ট ফোরাম, ফিলিস্তিনি মানবিক সহায়তা সংস্থা, ছারছীনা দারুসসুন্নাত সোসাইটি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পীর সাহেবকে সম্মাননা স্মারক, ক্রেস্ট এবং ফুলেল শুভেচ্ছা প্রদান করা হয়। বিশেষভাবে মিশরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সর্ববৃহৎ প্ল্যাটফর্ম ‘ইত্তেহাদ’-এর পক্ষ থেকে সংগঠনের উপদেষ্টা প্রধান শিহাবউদ্দিন আল-আযহারী সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। এছাড়া ভারতের ঐতিহ্যবাহী ফুরফুরা দরবার শরীফের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন।

বক্তব্যে বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শতাব্দীজুড়ে ছারছীনা শরীফের শিক্ষা, দাওয়াহ, সমাজকল্যাণ ও মানবসেবামূলক অবদানের কথা তুলে ধরেন। ইত্তেহাদুল আরবের সভাপতি ড. মোহাম্মাদ মাখযুমি তাঁর বক্তব্যে বলেন, তাসাউফের বিশুদ্ধ চর্চা, মানবিক মূল্যবোধ এবং ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচারে ছারছীনা দরবার শরীফের ভূমিকা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মাঝে ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি। ছারছীনা দরবার শরীফের আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা ‘হেমায়েতে ইসলাম বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে মিশরে অবস্থানরত ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু পরিবারের মধ্যে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মানবিক উদ্যোগ উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে গভীর আবেগের সঞ্চার করে।

সমাপনী বক্তব্যে পীর সাহেব হযরত মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছারুদ্দীন আহমদ হুসাইন (হাফিজাহুল্লাহ) মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বিশুদ্ধ আকিদা, উত্তম আখলাক, তাকওয়া এবং সুন্নতে নববীর আদর্শে নিজেদের গড়ে তুলে উম্মাহর কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার আহ্বান জানান।

দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটে। আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা, আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্য এবং মানবিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য সমন্বয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান অংশগ্রহণকারীদের হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।

লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top